রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

রফিকউদ্দিন আহমদ: ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ

পংকজ পাল

ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের পারিল (বর্তমান রফিকনগর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুল লতিফ ও মাতা রাফিজা খাতুন দম্পতির পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে রফিক ছিলেন বড় সন্তান। রফিকের দাদার নাম মোঃ মকিম উদ্দিন। রফিক ১৯৪৯ সালে উপজেলার বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাশ করে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন।

রফিকের বাবা আবদুল লতিফ তখন ঢাকায় মুদ্রণব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজেকে। আর রফিকের ভগ্নিপতি মোবারক আলী হাজি ওসমান গনি রোডে শুরু করেছেন বই বাঁধাইয়ের কারখানা। রফিক ইতিমধ্যে দেবেন্দ্র কলেজের পাঠ অসম্পূর্ণ রেখে ভর্তি হয়েছেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। পড়ালেখার পাশাপাশি বাবার প্রেসের কাজ দেখাশোনা করছেন।

পলিমাটি
 
পলিমাটি
শহীদ রফিক

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। সে রাতে রফিক উদ্দিন গিয়েছেন ভগ্নিপতির কারখানায়।শহরজুড়ে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে —রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আগামীকাল ছাত্ররা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে জড়ো হবেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।আর অন্য সবার মতো রফিকের ভগ্নিপতি মোবারক আলী খানও নিশ্চিত বড় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। সংশয়ে, শঙ্কায় মোবারক আলী রফিককে মিছিল-মিটিংয়ে যেতে নিষেধ করলেন। মাঝরাতে রফিক ফিরে গেলেন নিজেদের প্রেসে।রফিক উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি পারিলের মেয়ে রাহেলা খাতুনের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং পরে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে ঠিক করা হয়। ২১ শে ফেব্রুয়ারি রফিকের বিয়ের বাজার নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও তিনি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের মিছিলে সেদিন যোগ দেন। এতো বড় একটা আন্দোলন থেকে কি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন রফিক? বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রয়াসে ১৪৪ ধারা ভাঙলেন। ফাল্গুনের অপরাহ্নে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হওয়ার পর তিনি অবস্থান নিলেন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনের রাস্তায়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করল, নিক্ষেপ করল টিয়ার গ্যাস, মিছিল ছত্রভঙ্গ করার জন্য নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করল। তপ্ত, তিক্ত সেই গুলি রফিক উদ্দিন আহমদের মাথার খুলি উড়িযে দেয়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে তিনিই প্রথম গুলিবিদ্ধ হন। ফলে সিংগাইরের কৃতিসন্তান রফিক উদ্দিন ভাষার জন্য প্রথম শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ছয় সাত জন আন্দোলনকর্মী তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। তাদের মাঝে ডাঃ মশাররফুর রহমান খান রফিকের গুলিতে ছিটকে পড়া মগজ হাতে করে নিয়ে যান। পাকিস্থান শাসক তাকে শহীদ করেও ক্ষান্ত হয়নি। তাঁর লাশ সেখান থেকে নিয়ে পুলিশ লুকিয়ে রাখে, পরে তার মৃতদেহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যায়। শহীদদের লাশ নিয়ে বড় ধরনের আন্দোলন হতে পারে এই ভয়ে পাকিস্তান সরকার শহীদ রফিকের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে সেদিন রাত ৩টায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় তড়িঘড়ি করে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে শহীদ রফিককে সমাহিত করা হয়।রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রফিক উদ্দিনের আত্মত্যাগের জন্য ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে। এছাড়া তার গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর করা হয়। সিংগাইর ও মানিকগঞ্জে রয়েছে তাঁর নামে সড়ক। হেমায়েতপুর-সিংগাইরের ধলেশ্বরী নদীর উপর শহীদ রফিক সেতু নির্মিত হয়েছে। এবং গ্রামে তার নামে ‘ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভবনের নাম ‘ভাষাশহীদ রফিক ভবন’ নামকরণ করা হয়।

bonus veren siteler
deneme bonusu veren siteler
casino siteleri
deneme bonusu
deneme bonusu veren siteler

লেখক পরিচিতি

অজয় কুমার রায়
অজয় কুমার রায়
কবি গল্পকার ও প্রাবন্ধিক অজয় কুমার রায় মানিকগঞ্জ জেলায় ঘিওর উপজেলার নারচি গ্রামে ১৯৪৮ সালের ৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-প্রয়াত অক্ষয় কুমার রায়,মাতা-দিভা রায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা,সাময়িকীতে ও যৌথ গ্রন্থে কবিতা,গল্প,নাটক প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অসংখ্য ফাইলবন্দী লেখা থেকে প্রথম গল্পগ্রস্থ ‘শতাব্দীর ক্ষুধা’ একুশে বইমেলা‘১৫ তে প্রকাশ হয়েছে। পরবর্তী বছর একক কাব্যগ্রন্থ 'রংধনু' প্রকাশিত হয়েছ ৷ তিনি অন্তরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ৷ তিনি শিল্প সাহিত্য ও মননের অনলাইন মাসিক'পলিমাটি'র উপদেষ্টা সম্পাদক ৷ এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। বিভিন্ন সংগঠন হতে বহু সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা