পাভেল পার্থ
গত বছর কেমন কেটেছে? এর উত্তর নানাজনের অভিজ্ঞতায় নানা কিসিমের। কিন্তু যদি মানুষ বাদে এই প্রশ্ন দেশের প্রাণ ও প্রকৃতির কাছে রাখা হয়, তবে এর উত্তর কী হবে? যদি পাখির কাছে প্রশ্ন করি, পতঙ্গ বা বৃক্ষের কাছে? এর উত্তর নিদারুণ ও রক্তক্ষয়ী। বছর জুড়ে নদী কি কৃষিজমিন খুন হয়েছে, ইটের ভাটায় পুড়েছে অরণ্য ও মাটির কলিজা। দেশি জাতের বীজ উধাও হয়েছে, বাতাস হয়েছে দূষিত। আরেক দিকে বেড়েছে এডিস মশার বংশ ও জীবাণুর সংক্রমণ। শুধু মানুষের সুখ আর বিলাসিতার কারণে, একতরফাভাবে মানুষের উন্নয়নের জন্য লাগাতার দেশ দুনিয়ার প্রাণ-প্রকৃতির গায়ে বিচারহীন জখমের দাগ লেগেছে। আসছে নতুন বছরে মানুষ প্রজাতি থেকে প্রকৃতির ওপর এই জুলুম কি থামবে? মানুষ কি পারবে রেহাই দিতে প্রাণের অসীম সম্ভাবনাকে?
আসছে নতুন বছরে তাই প্রাণ ও প্রকৃতির আরাধনার ডাক দিতে চাই। গ্রাম-বাংলার সহস্র বছরের প্রকৃতিসংলগ্ন জীবনকৃত্য আবার উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক। আসছে বছর হোক প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি মানুষ প্রজাতি হিসেবে আমাদের সংগ্রামী কৃত্যের বছর। ‘কৃত্য’ মানে যা করণীয়, মানুষ যা করে থাকে বা করত বা করে চলে। বেশ কিছু পুস্তকি দলিল ও অধিপতি উপস্থাপন কৃত্য বলতে বোঝাতে চায় পূজা-পার্বণ, আচার-অনুষ্ঠানসহ ধর্মীয় চর্চারীতির কিছু প্রশ্নহীন একক পরিবেশনাকে। কিন্তু বাংলাদেশের নিম্নবর্গের যাপিত জীবনে কৃত্য মানে এক স্রোতস্বী সঞ্জীবনী। যার পরতে পরতে জনজীবনের বিশ্বাস, রীতি ও চর্চার বীজদানাগুলো অঙ্কুরিত হয়ে থাকে। নিম্নবর্গের কৃত্য-দর্শন হলো, প্রাণ ও প্রকৃতির আরাধনা। প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি আরাধনাই হয়ে উঠুক আসছে বছরে আমাদের এক দুর্বিনীত শপথ।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বাঙালি হিন্দু নারীর শস্য ফসলসহ মানুষের বীজ ও বংশ-রক্ষার নানা কৃত্যরীতি আছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বাংলা কার্তিক-সংক্রান্তিতে আয়োজিত ‘জালাবর্ত’ এমনই এক গ্রামীণ আয়োজন। কার্তিক ও আশ্বিন মাসে এখানকার গ্রামীণ জনপদ ভোলা-সংক্রান্তি ও ওলা-সংক্রান্তি পালন করে। এগুলো প্রতিটিই কৃষি লোকাচার। নারীরাই যে ক্ষেত কৃষির প্রাণ, নারীর মাধ্যমে পালিত এসব কৃষি আচার দেখলেই তা বোঝা যায়। মূলত শস্য ফসলসহ সন্তানের আয়ু ও মঙ্গল কামনায়, বীজ ও সন্তানের বংশ-রক্ষায় এই ব্রত পালন করা হয়। জালাবর্তে জালা হলো মাঙ্গলিক চিহ্ন। জালা যেভাবে ফুটে ওঠে, এভাবে যেন বীজ ও বংশের বীজ ফুটে ওঠে। জালাবর্তের প্রধান উপকরণ ধানসহ নানা শস্য ফসলের বীজ। প্রায় মাসব্যাপী গ্রামীণ নারীরা এসব বীজকে সন্তানের মতো পরিচর্যা করে এর জালা (অঙ্কুরোদগমিত চারা) তুলে ব্রত আচার পালন করেন। জালাবর্তের মাধ্যমে সংরক্ষিত শস্য ফসলের বীজের সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা সঠিক আছে কি না তাও যাচাই হয়ে যায়। যদি বীজ ঠিকমতো না গজায়, তবে বীজ বদলে অন্য বীজ আরও কঠোর নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি এই বীজের মাধ্যমে বীজের অঙ্কুরোদগম হার ফসল রোপণের আগেই জানা যায়। ফলে ফসল চাষের আগে প্রস্তুতিসমূহও ঠিকভাবে নেওয়া সম্ভব হয়। এই ব্রতের ভেতর দিয়ে কার বাড়িতে কী ধরনের ধানসহ শস্য ফসলের বীজ সংরক্ষিত আছে এবং কে কোন ধরনের জাত সংরক্ষণ করছেন, তাও একটি গ্রামসমাজে নথিভুক্ত হয়ে যায়। আর এভাবেই গ্রাম-জনপদের নারীরা বীজ ও বংশ-রক্ষার আপন দলিল সব আগলে রেখেছেন বৈচিত্র্যময় সব জালাবর্তের ভেতর দিয়েই, একটি পুরুষতান্ত্রিক পুস্তকি শাস্ত্রীয় রাষ্ট্রধর্ম যাকে শুধু ‘লোকসংস্কৃতি’ বলে আড়াল ও অপর করে রাখতে চায় চিরকাল।
দেশের নিম্নবর্গের মানুষ ভূমিকে মানুষ ‘কল্পনা’ বা ‘প্রতীক’ বা শুধু ‘উর্বরতা’ দিয়ে মাপে না বা বিচার করে না। ভূমি ও মাটি মানুষের যাপিত জীবনের অংশ, সংসারের একজন। তাই এই জনপদে ভূমিকে ঘিরে আছে নানা কৃত্য-আচার রীতি ও উৎসব। মাটি ও মাকে এক করে দেখার ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কাজ করলেও মাটি কোনোভাবেই পুরুষ নয়। এর কারণ নারী ও ভূমি সব নিপীড়ন সহ্য করে ‘সর্বংসহা’ হয়ে থাকবে বলেই নয়। এর আরও মানে আছে। জনমানুষের লোকায়ত ইতিহাসে ভূমির ব্যবহার ও সম্পর্ক বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু ও আদিবাসীদের ভেতর অনেকেই পৃথিবীকে নারী হিসেবে বিবেচনা করেন। নারীর যেমন এক নির্দিষ্ট ঋতু ও কালে ঋতুস্রাব হয়, ঠিক তেমনি এক নির্দিষ্টকালে পৃথিবীরও ঋতুস্রাব হয় বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দু কৃষক পরিবারের নারীদের ভেতর এ সময় মানে আষাঢ় মাসে অম্বাবচী ব্রত পালন করতে দেখা যায়। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী ‘অম্বাবচী’ নামটি বহুল ব্যবহৃত হলেও, কোথাও কোথাও ‘অম্বুবচী’, ‘অম্বুবাচী’, অম্বুবুচী বলতে শোনা যায়। টাঙ্গাইল অঞ্চলের কোচদের ভেতর এই পর্ব ‘আমাতি/আমতি’ নামে পরিচিত। গাজীপুরের বর্মণ-ক্ষত্রিয়রা একে ‘আমচি/আমাচি/আমাতি’ বলেন। এ সময় মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করা যায় না। বীজদানা রোপণ করা যায় না। কারণ ঋতুস্রাবের এ সময় ধরণি মাতা কষ্ট পেলে সবাই কষ্ট পাবে এমনই বিশ্বাস নিম্নবর্গের জীবনে। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগের একভাগ জুড়েই হাওরভূমি। সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাতটি এলাকা নিয়ে যে বিশাল হাওর এলাকা এই এলাকার অনবদ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর নির্ভর করেই এখানে গড়ে উঠেছে জনজীবনের নানা বৈচিত্র্যময় কৃত্যের রূপ ও ছন্দ। আমন ধান ঘরে তোলার পর মূলত শীতকালে হাওরাঞ্চলে আয়োজন করা হয় ষাঁড়ের লড়াই, স্থানীয়ভাবে যা ষাঁড়ের নাড়াই হিসেবে পরিচিত। মূলত পৌষ থেকে পুরো বৈশাখ মাসে ভাটি-বাংলার ক্ষেত-ময়দান খলা কিততাতে বসে আড়ঙ্গ, ষাঁড়ের লড়াই উপলক্ষে গ্রামীণ মেলা। হাওর এলাকার কোনো গৃহস্থ বাড়িতে একটি ষাঁড়কে বিশেষ যতœ নিয়ে পরিচর্যা করা হয়। নানা আচার-রীতি পালন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে কবিরাজ বা কারিগর বা ফহির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কবিরাজের পাশাপাশি বাড়ি কি গ্রামের সবাই একটি ষাঁড়কে সামাজিক মালিকানায় পরিণত করতে বছরব্যাপী যা পালন করেন, তাই এক সমন্বিত কৃত্যরূপ পেয়েছে।
নিম্নবর্গের নিত্যদিনের পরিচিত অসুখ-বিসুখের চিকিৎসায় নানা কৃত্য-আচারসমূহও এক সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। বাঙালি হিন্দু ও কোচ-বর্মণ-রাজবংশী সমাজে শীতলা হলেন বসন্ত রোগের দেবী। ফাল্গুন মাসে বসন্ত রোগ না হওয়ার মানতে বেশ ঘটা করেই আয়োজিত হয় শীতলা পূজা। সাংসারিক মান্দি সমাজেও নানা পূজা ও উৎসব পালিত হয় অসুখ-বিসুখ সারাতে। গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের চান্দারবিল এলাকায় হেচড়া দেবীও পূজিত হন বসন্তকালে খোস-পাঁচড়া নিরাময়ের মানতে। ফাল্গুন মাসে খোস-পাঁচড়া, চুলকানিসহ ত্বকের রোগগুলো বেশি ছড়ায় এবং শিশুদের হয় বলে এই পূজা বাঙালি হিন্দুদের ভেতর মূলত শিশুদের মাধ্যমেই আয়োজিত হয় এক ঐতিহাসিক ধারায়। চান্দারবিলে প্রতি বাঙালি হিন্দু বাড়িতেই ফাল্গুন মাসের ১৫ তারিখ থেকে মেয়েশিশুরা (অবশ্য ছেলেশিশুরাও করে) হেচড়াব্রত পালন করে ১৫ দিন। তারা বাড়ির উঠোনে নিজেরাই মাটি কেটে একটি হেচড়ার পুঁতা (বেদি) তৈরি করে। হেচড়ার পুঁতায় একটি বড়ইগাছের ডালপাতা ফেলে পুঁততে হয়। প্রতিদিন ভোর ও বিকেলবেলায় শিশুরা স্থানীয় এলাকা থেকে মিষ্টিকুমড়ার ফুল ও বউন্যার ফুল জোগাড় করে বরই ডালে গেঁথে চিনি-কলা দিয়ে হেচড়ার সভা (সেবা) দেয়। সকালবেলা মিষ্টিকুমড়ার ফুল এবং বিকেলবেলা সব পরিষ্কার করে আবার বউন্যার ফুল দিয়ে এটি করতে হয়। হেচড়ার পুঁতার কাছে একটি বুড়ির ঘর বানাতে হয়। এতে ব্রতের সব উপাচার ও উপকরণ রাখা হয়। মূলত ফাল্গুন-সংক্রান্তির দিন হেচড়া পূজা করা হয়। এদিনে শিশুরা স্নান সেরে আগের বরই ডালটি জলে বিসর্জন দিয়ে শিশুদের হাতের মাপে প্রায় তিন-চার হাত লম্বা একটি নতুন বরই ডালপাতাসহ হেচড়া পুঁতায় পুঁতে পূজা শুরু হয়। পূজার দিন সব ধরনের ফুল দিয়েই হেচড়া ডাল সাজানো যায়। তবে পূজার দিন অবশ্যই ভাটির ফুল লাগে। পূজার আগে হেচড়ার বেদি লেপে-মুছে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে সাজানো হয়। বরই ডালে লাল সুতা বাঁধা হয়। কেউ কেউ বরইয়ের ডালকে রঙিন কাপড় পরায়। ডালেও সিঁদুর ফোঁটা দেওয়া হয়। পূজা শিশুরা নিজেরাই নানা গান গেয়ে সেরে নেয় এবং খোস-পাঁচড়া না হওয়ার জন্য হেচড়া দেবীর কাছে প্রার্থনা করে। অনেকে পূজার আগের দিন গ্রাম ঘুরে ঘুরে হেচড়া পূজার মাঙন সংগ্রহ করে। সংগৃহীত চাল-ডাল দিয়ে শিশুরাই নিজেরা রান্না করে খায়। শিশুরা পূজার পর সবাইকে চিনি-কলা ও অন্য ফলফলাদির প্রসাদ ভাগ-বণ্টন করে বিলিয়ে দেয়। পূজা শেষে হেচড়ার পুঁতা আবার সমান করে দেওয়া হয়, বুড়ির ঘর ভেঙে ফেলা হয় এবং বরইয়ের ডাল নিয়ে শিশুরা পাড়া ঘুরে স্থানীয় কোনো পুকুর বা বিলে বিসর্জন দেয়। মূলত হেচড়া পূজার পুরো ১৫ দিন জুড়ে থাকে শিশুদের আনন্দ আর নিত্যনতুন প্রকৃতি পাঠের আসর। এখানে শিশুরা প্রতিদিন নানা ফুলের নামপরিচয় জানে, খোস-পাঁচড়া ও চুলকানি সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সচেতন করে তুলে, সংগঠিত হয়ে কাজ করার মানসিকতা জন্মায়।
সুনামগঞ্জসহ দেশের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে করচ, বরুণ, হিজল, তমাল, কদম, শ্যাওড়া, বট, পাকুড়, অশ্বত্থগাছগুলো পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে কালের ধারাবাহিকতায় হাওর-ভাটির সংস্কৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। এসব গাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাওরাঞ্চলের স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও জীবনযাপনের বিস্তার। হাওরবাসী শ্রদ্ধা-বিশ্বাস ও ভালোবাসায় সংরক্ষিত এসব পবিত্র বৃক্ষ ও স্থান রক্ষায় হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছেন প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক দুর্দান্ত প্রতিবেশীয় সংগ্রাম। সারা দুনিয়ায় বিলুপ্ত নরম-কালো কাছিম এখনো সংরক্ষণ করে চলেছেন দেশের নিম্নবর্গের জনগণ চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারে। বাগেরহাটের খানজাহান আলী মাজারের কুমির বা সিলেটের হজরত শাহজালাল মাজারের জালালি কবুতর ও প্রবীণ গজার মাছ তো বাঁচিয়ে রেখেছেন দেশের প্রান্তিক জনগণ তাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসায়। প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষার নিম্নবর্গের এ সংগ্রামই দেশের কৃত্যজীবনের মূল সুর ও ব্যঞ্জনা। কৃত্য কেবলমাত্র কোনো একটি বা এক দিনের বা কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের কোনো অনুষ্ঠান বা আচার বা পার্বণ বা উৎসব বা পূজাপদ্ধতি নয়। কৃত্য একটি অঞ্চলের জনমানুষের প্রাত্যহিক ক্রিয়া ও আরাধনার সমন্বিত আখ্যান। আমরা যখনই একে বিচ্ছিন্ন করে আলাদাভাবে শুধু একটি কোনো রীতি বা অনুষ্ঠান হিসেবে দেখি, তখনই তা নিম্নবর্গের যাপিত জীবনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। কৃত্যকে দেখা ও জানা-বোঝার এ অধিপতি ধারা থেকে সরে এসে নিম্নবর্গের যাপিত জীবনের সামগ্রিক প্রণালি হিসেবেই একে পাঠ করা জরুরি।
লেখক : প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ৷


