গ্রামের নাম শ্রীপুর। ছায়া সুনিবিড়, সৌন্দর্য-মণ্ডিত একটি পল্লী এলাকা। গ্রামের পাশ দিয়ে কলকল করে বয়ে চলেছে একটি নদী, ছলছল করে তার জল। নদীর তীরে চিকচিক করা বালি আর কাশফুলের সাদা নিয়ে এক নয়ন ভোলানো সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। বিলেঝিলে ফুটে থাকে শাপলা-শালুক রাশি রাশি। মাছরাঙ্গার মাছ শিকার, গাঙচিল-পাতিহাঁস সব মিলে অন্য রকম এক পরিবেশ। মাঠে মাঠে সবুজ ধানের শিষে বাতাস লেগে দোল খায়। মাঠের পাশে কলমিলতা ফুটে হাজারে হাজার, বর্ষার দিনে কদম আর ফাল্গুনের কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে যায় সারা গ্রাম। গ্রামের মানুষও সহজ-সরল। হিন্দু-মুসলমান সব ধরনের লোকের বসবাস এখানে। গ্রাম হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে গ্রামটি অন্যান্য গ্রামের চেয়ে এগিয়ে। স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, হাসপাতাল-ডাকঘর থাকায় এটি একটি আধুনিক গ্রাম। এই গ্রামেরই ছেলে প্রিতম, বয়স বিশ বা একুশ হবে। কলেজে পড়ুয়া বড় ভাল ছেলে।
হাসি-খুশি ভরা গ্রামের লোকজনের হাসি হঠাৎ করেই থেমে গেল। একদিন সারা গ্রামে কানাকানি শুরু হলো, দেশে এখন বড় বিপদ। পাকিস্তানীরা ঢাকাসহ সারা দেশে অকাতরে নিরীহ মানুষ মারছে। শ্রীপুরের দিকেও ধেয়ে আসছে হায়েনারা।
আতংকিত গ্রামবাসী, কারও মুখে কোন কথা নেই। বিকেল বেলা সারা গ্রামে শোরগোল উঠল- ‘যে যেখানে পারো পালিয়ে যাও, শহর থেকে মিলিটারি আসছে।’ আর অমনি ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল। সবাই গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে, প্রিতম আর ওর বন্ধুরা মাঠে গল্প করছিল। ওরা দেখল সারি সারি জলপাই রঙ্গা জিপ, একটানা বাজছে সাইরেন। মেশিন গান হাতে কয়েক শ পাক সেনা ঢুকছে গাঁয়ের দিকে। সবার মাথায় লোহার টুপি, পরনে খাকি পোশাক, পায়ে বড় বড় বুট। রাস্তার ধূলো উড়িয়ে ধেয়ে আসছে মিলিটারি জিপ। প্রিতমরা সবাই হতভম্ব হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইলো।
মিলিটারি জিপ এসে থামল গ্রামের স্কুল ঘরের সামনে। জিপ থামতেই একটা মোটা লম্বা আর একটা রোগা লিকলিকে লোক এসে সালাম ঠুকলো। গোধূলির আবছা আলোয় প্রিতমরা দেখলো, এরা তো গ্রামেরই মানুষ। কেরামত আলী মাতব্বর আর তার চামচা কদু মিয়া।
প্রিতমরা তাড়াতাড়ি চলে গেল গ্রামের স্কুল শিক্ষক আশুতোষ স্যারের নিকট। গিয়ে দেখল স্যার বিষণ্ণ বদনে চেয়ারে বসে কি যেন ভাবছেন। প্রিতমদের দেখেই তিনি বললেন- ‘সবই তো শুনেছ, দেশে খুব বিপদ, পাকিস্তানীরা আমাদের গ্রামেও ঢুকলো। এখন নিরীহ মানুষ গুলোর যে কি হবে? চলো,চেয়ারম্যানের কাছে যাই।’
: স্যার, চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে লাভ নেই, চেয়ারম্যানের খাস চামচা কেরামত আলী আর কদু মিয়াকে দেখলাম পাক বাহিনীর সাথে কথা বলতে
: কি বল এসব? শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশের লোকজন ওদের সাথে হাত মিলালো, এখন কি হবে?
: স্যার, গ্রামের সবাই আশে পাশে চলে যাচ্ছে। এখন আমরা কি করব?
: না গিয়ে কি করবে বল? প্রাণের মায়া তো সবারই আছে। শয়তানেরা কখন যে কি করবে তা বলতে পারছি না, তবে ওরা যখন এ গ্রামে এসেছে, তখন আমাদের সামনে অবশ্যই বিপদ আছে। আমি তো নিজেকে নিয়ে ভাবি না, ভাবি গ্রামের সবাইকে নিয়ে। তোমরা সবাই চোখ-কান খোলা রেখো আর সাবধানে থেকো। হে ঈশ্বর, তুমিই জানো আমাদের কপালে কি আছে?
প্রিতমরা সবাই আশুতোষ স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
মধ্যরাতে হানাদার বাহিনী আর এ দেশীয় শয়তানেরা ঝাপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের ওপর। শীতের রাত সবাই ছিল বিছানায়। গ্রামের ঘর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং গ্রামবাসী কিছু বোঝার আগেই বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করতে থাকে হানাদার বাহিনী। শুরু হয় এলোপাথারি ছোটাছুটি। আর্তনাদ আর চিৎকারে সমস্ত গ্রাম ডুবে যায় নারকীয় অবস্থার মধ্যে। জ্বলতে থাকে বাড়ির পর বাড়ি, পাশাপাশি চলতে থাকে ধর্ষণ, হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ। গ্রামটি পরিণত হয় একটি লাশের গ্রামে, নিরব মৃত্যুপুরীতে।
শেষ রাতের দিকে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শেষ হয়। দূর থেকে ভেসে আসে আর্তনাদ আর চিৎকারের শব্দ, দেখা যায় আগুনের লেলিহান শিখা।
পরের দিন সকালে প্রিতম আর ওর বন্ধুরা সবাই গ্রামে ঘুরে ঘুরে খোঁজ খবর নিল। সারা গ্রাম যেন একটা মৃত্যুপুরী। এলোপাথারি পড়ে আছে মানুষের লাশ, কারো মা, কারো বোন এবং কারো ভাইকে হত্যা করেছে পাক বাহিনী। অবুঝ শিশু থেকে আরম্ভ করে পশুপাখি কাউকে ছাড় দেয়নি শয়তানেরা। মানুষের পাশে গবাদি পশুর মৃত দেহও পড়ে আছে। যারা বেঁচে আছে তারা তাদের স্বজনদের লাশের পাশে আহাজারি করছে, প্রাণের মায়ায় অনেকেই কোথায় পালিয়েছে তার হদিস নেই।
প্রিতমদের সাথে আশুতোষ স্যারের দেখা হলো। তার মুখে কোন কথা নেই, তিনি যেন নির্বাক হয়ে গেছেন। এই হত্যাযজ্ঞ দেখে স্যার এতক্ষণে বললেন- ওরা কাউকে ছাড়বে না, গত কাল দক্ষিণ পাড়ায় ঢুকেছিল, আজ হয়তো অন্য পাড়ায় ঢুকবে।
গ্রামবাসী সবাই মিলে কোন রকমে তাড়াতাড়ি লাশগুলোর সৎকারের ব্যবস্থা করলো।
সন্ধ্যে বেলায় সুমন, দেলোয়ার, প্রিতম আর চিত্ত- আশুতোষ স্যারের বাসায় গেল। স্যার ওদের দেখেই বললেন- তোমরা তো শুনেছো কদু আর কেরামত পাক-সৈন্যদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে টহল দিচ্ছে। ওরা তোমাদেরকে ফলো করছে। কি যে করি?
দেলোয়ার বলল- স্যার আমরা কি করব ভেবে পাচ্ছি না।
স্যার বললেন- ঢাকার অবস্থা আরো খারাপ। তোমরা বাড়িতে যাও এবং যথা সম্ভব নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকো।
রাতটা সবার আতংকে কাটলো। কিন্তু গ্রামে কোন হামলা হলো না। পরের দিন সকালে শোনা গেল পাক বাহিনী, কেরামত আর কদু বাড়ি বাড়ি গিয়ে জোরপূর্বক যুবতী মেয়ে-বধূদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। যারা বাঁধা দিয়েছে ওরা তাদেরকেও ধরে নিয়ে গেছে।
আশুতোষ স্যার- প্রিতমদের সবাইকে খবর পাঠালেন তার সাথে দেখা করার জন্য।
বিকেলে স্যার প্রিতমদের নিয়ে বসলেন। কেউ কিছু বলছে না। তাই স্যার বললেন-শোন, তোমরা যুবসমাজ, তোমাদের দেশের এই বিপদে এগিয়ে আসতে হবে। তোমরা অনেক কিছু করতে পার, তোমাদের শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক থেকে তোমাদের অনুপ্রেরণা নিতে হবে। তিনি বলেছেন- ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’
প্রিতম বলল- স্যার আমরা কী করব?
: তোমরা ওদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে
: কিভাবে সম্ভব? দেলোয়ার বলল।
: আমি সব ব্যবস্থা করব। তোমরা তো জান সারা দেশে মুক্তিবাহিনী নামে একটি বাহিনী তৈরি হয়েছে, দেশের সর্বস্তরের মানুষ নিয়ে। সেখানে আছে ছাত্র, যুবক, কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পুলিশ আরো অনেকেই। তোমরাও মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করবে। তোমরা কি দেশের এই বিপদের দিনে এগিয়ে আসবে না?
কেউ কিছু বলল না।
স্যার বললেন- সামেজ আলীর মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে, শ্রীধরের মেয়ে, রহমতের মেয়েকেও ধরে নিয়ে গেছে। আবুল মেম্বার বাঁধা দেওয়ায় মেম্বারকেও নিয়ে গেছে। কাল হয়তো আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। এমন সময় আসবে তোমাদের মা-বোনদের ধরে নিবে তখন কি অবস্থা হবে ভাবতে পার? শোন, মরতে যখন হবে তখন লড়াই করে বীরের মত মরাই ভাল। এভাবে ঘরে বসে থেকে লাভ নেই।
এবার সবাই বলল- হ্যাঁ, আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করব, শত্রুর মোকাবেলা করব। এতে যদি জীবন চলে যায়- যাবে।
এবার স্যার বললেন- একটু শান্তি পেলাম, আমার সোনার ছেলেরা আছে, আমাদের জয় হবেই। অন্যায় অপশক্তি আমাদের ন্যায় শক্তির কাছে টিকতে পারবে না। শোন রাত দশটার সময় নদীর পাশে ঝাউ বনে সবাই আসবে, আমি আমার ঢাকার এক মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার বন্ধুকে নিয়ে আসবো। সে তোমাদের সব বুঝিয়ে দিবে। তবে সাবধান একথা যেন কেউ না জানে, জানলে তোমাদের বিপদ হবে।
রাতে প্রিতম আর বন্ধুরা ঝাউ বনে মিলিত হল। সেখানে ঢাকা থেকে আগত মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে, ট্রেনিং সম্পর্কে মূল্যবান কথা বললেন। সিদ্ধান্ত হলো আগামী কাল রাত থেকেই ট্রেনিং শুরু হবে। তাই গ্রাম ছাড়তে হবে তাড়াতাড়ি।
শুরু হল অন্য জীবন। অনেকেই ট্রেনিং এর জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। আবার কেউ কেউ গ্রামেই রয়ে গেল ওদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য।
ওরা আশুতোষ স্যারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে সর্বশেষ খবর নিচ্ছে। প্রিতম, সুদীপ্ত, দেলোয়ার, পার্থ, সৌরভ, শামীম, চিত্ত, রাজু, সুমন, মাসুদ, অমিত, লোকনাথ, মতি, বদরুল, তপু- এই ১৫ জনে একটি গেরিলা দলে তৈরি হলো।
কয়েকদিন পর প্রিতম, সুমন, দেলোয়ার ও পার্থ গ্রামে ফিরে এল। ওরা এসে জানতে পারলো গ্রামে শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছে। শান্তি কমিটির প্রধান হয়েছে কেরামত আলী মাতব্বর। চেয়ারম্যানও না কি গোপনে ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। শান্তি কমিটির লোকজন সগর্বে গ্রামে গ্রামে ঢুকে খোঁজ নিচ্ছে- কারা কারা মুক্তিবাহিনীতে গেছে। কারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছে। যারা মুক্তিযুদ্ধে গেছে তাদের বাড়ির লোকজনকে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করছে।
ওরা ওদের মা-বাবা, আশুতোষ স্যার সবার কাছ থেকে আশির্বাদ নিয়ে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। সুমন বলল- ‘প্রিতম, চল প্রিয়তাদের খবর কি জেনে আসি।’ প্রিতম মনে মনে তাই ভাবছিল, কিন্তু চিরকালের লাজুক হওয়ায় তা প্রকাশ করছিল না। প্রিয়তা পাশের গ্রামের মেয়ে এবং প্রিতমের সহপাঠী। দীর্ঘ দিন ধরে তাদের মধ্যে মন দেওয়া নেওয়া চলছে।
দেশের এই পরিস্থিতিতে প্রিয়তাও, প্রিতমকে বলেছে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য। বাংলা মাকে স্বাধীন করার জন্য। প্রিয়তাদের গ্রামটি চেয়ারম্যানের নিজ গ্রাম হওয়ায় এই গ্রামে এখনো তেমন কিছু হয়নি। প্রিয়তা ওদেরকে গুড় আর মুড়ি দিল। দেলোয়ার ইচ্ছে করেই সুমন আর পার্থকে নিয়ে প্রিয়তার বাবা- মার সাথে কথা বলে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালো। প্রিয়তা-প্রিতমকে একটি রুমাল দিয়ে বলল- যখন মন খারাপ করবে তখন এটা দেখবে। প্রিতম দেখল- রুমালটায় প্রিয়তা লিখেছে বিজয় এবং নিচে লিখেছে ভালো থেকো। দু’জনেই দু’জনকে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানাল।
পরদিন জীবন ভাই মুক্তি ক্যাম্পে খবর নিয়ে এলো রাতে শান্তি কমিটির লোকজন আশুতোষ স্যারকে পাকসেনাদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে। যে সব পরিবার মুক্তিবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে, মেয়েদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে গেছে।
মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার বলল- আর দেরি নয়, তোমাদের অপারেশনে যেতে হবে। তোমাদের প্রথম অপারেশন হবে তোমাদের গ্রামেই। আমি অন্য ক্যাম্পগুলোতে সংবাদ পাঠিয়ে দিচ্ছি, তোমাদের গ্রামে যাওয়ার জন্য। তোমাদের সহযোগিতা করার জন্য ৷
আলো আঁধারিতে ভরা চারপাশ। দিনের আলো তখনও ফোটেনি। চারদিক নিরব। এরই মধ্যে দূর থেকে ভেসে এলো দুপদাপ শব্দ। সময় যতো যাচ্ছে, আওয়াজও ততই বাড়ছে। আর সেই আওয়াজে গ্রামের সবার মধ্যে আতংক ছড়াচ্ছে। আজ কাল কারো চোখে ঘুম নেই, কখন কি হয়? দিন নেই রাত নেই হঠাৎ ভেসে আসে গুলির আওয়াজ।
গ্রামের অনেকের মতই প্রিয়তাও ভয়ে ভয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল ১৪-১৫ জনের একটি দল গ্রামের পথ ধরে ছুটে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাপারটা স্পষ্ট হল ওর সামনে। দলের সবার হাতে একটি করে অস্ত্র। অথচ এদের দেখে কেউ ভয় পেল না বরং সবাই খুশি। কারণ ওরা গ্রামেরই ছেলে, দেশকে দুশমনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছে, ওরা মুক্তিযোদ্ধা। এই হাড় কাঁপানো শীতের রাতে ওরা এগিয়ে আসছে। প্রিয়তা এবার ভাল করে দেখল- প্রিতম, আশুতোষ স্যার ও সৌরভকে। ওদের সাথে আরো অনেকেই আছে। ওরা তাহলে স্যারকে উদ্ধার করেছে! কি যে ভালো লাগছে তার। সে ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, দৌড়ে রাস্তায় নেমে এলো। প্রিতমের সাথে তার দৃষ্টি বিনিময় হল। মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়া পর্যন্ত লোকজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল।
পরের দিন আরো বেশি পাকসেনাদের গাড়ি আসল শ্রীপুর গ্রামে। রাতে পাকবাহিনী কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামে গ্রামে হানা দিল। মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। প্রিতম ওর দল নিয়ে গ্রামের কিনারায় বয়ে যাওয়া নদীর ধারে ঝোপের পাশে তৈরি হয়ে নিল। কিছুক্ষণ পর পাকবাহিনীর দুটি দল এদিকে আসা মাত্রই মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করা শুরু করল। গোলাগুলির এক পর্যায়ে পাকিস্তানীরা গ্রামের রাস্তা ঘাট না চেনায় মুক্তিবাহিনীর সাথে কৌশলে টিকতে পারলো না। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে একটা গুলি এসে বিধল সৌরভের বুকে। প্রিতম-সৌরভের দিকে এগিয়ে এলো, পার্থ-দেলোয়ারসহ অন্যান্যরা পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ করতে লাগল। প্রিতমকে সৌরভ বলল “বন্ধু, কথা দাও যেকোন মূল্যে দেশকে মুক্ত করবে।” প্রিতম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ার একটু পরেই সৌরভ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ল। ততক্ষণে পাকিস্তানীরা শেষ। পার্থ, সৌরভের লাশটা কাঁধে নিয়ে সামনে আর তার পিছনে অশ্রু সিক্ত নয়নে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে চলল।
এরপর কয়েকদিন পাকিস্তানী বাহিনী যত্রতত্র আক্রমণ করে যাকে সামনে পেল তাকেই হত্যা করল। অনেকে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিলো। জীবন ভাই ঝাউ বনে মুক্তিসেনাদের এসে খবর দিয়ে গেল যে পাকবাহিনীরা বেপরোয়া ভাবে অত্যাচার করছে। প্রিতমরা সবাই গ্রামের দিকে রওয়ানা হল। গ্রামের পথের কোণে একটা জটলা দেখে ওরা সেখানে গেল। একটা মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে। দূর থেকে দেখেই প্রিতমের মনটা কেমন করে উঠল।
কাছে গিয়ে সে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারল না। তার প্রিয়তা এভাবে ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে! প্রত্যক্ষদর্শীরা বলল, পাকবাহিনীরা গ্রামে ঢুকে প্রিয়তাদের বাড়িতে গিয়ে প্রিয়তাকে নিয়ে ক্যাম্পে যাচ্ছিল। এক সময় প্রিয়তা চলন্ত জিপ থেকে লাফিয়ে পড়ে নিজের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য এবং গড়িয়ে পড়ে যায় নদীতে। পাক বাহিনী চলে গেলে আশেপাশের লোকজন এসে তাকে উপরে নিয়ে আসে।
প্রিতম মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফটরত প্রিয়তাকে জড়িয়ে কাঁদছে। প্রিয়তা বহু কষ্টে বলল- ‘প্রিতম, তুমি কাঁদছো কেন? বিজয় আমাদের হবেই। তুমি কি আমার দেহটাকে স্বাধীন দেশে রাখতে পারবে না? তোমাকে পারতেই হবে আমাকে ক-থা-দা-ও।’ প্রিতম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো, কিছুক্ষণ পর প্রিয়তা হারিয়ে গেল কালের অতল গর্ভে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।
প্রিতম মানসিক ভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়ে। আশুতোষ স্যার তাকে অনেক বুঝিয়ে আবার যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উজ্জীবিত করে।
মুক্তিবাহিনী এবং ভারত থেকে আগত মিত্র বাহিনীর সম্মিলিত যুদ্ধের পর ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে রেসকোর্সের ময়দানে মিত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে ঘৃণ্য অপরাধী, অত্যাচারী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জেনারেল নিয়াজী। এভাবে বাংলার আকাশে উদিত হয় রক্ত লাল সূর্য, দেশ হয় স্বাধীন।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধা মতি, বদরুল, তপু, বিভিন্ন খণ্ড যুদ্ধে শহীদ হয়। শামীম, অমিত হারায় তাদের একটি পা। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রিয়জনদেরকে চিরদিনের জন্য হারায়, অনেকের লাশের সন্ধান পাওয়া যায় না আবার শিয়াল- শকুনে খায় অনেকের লাশ। আশুতোষ স্যারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি ১৪ ডিসেম্বর থেকে। তিনি বেঁচে আছেন না কি মরে গেছেন তা কেউ জানে না।
মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের পর, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কেরামত মাতব্বর, কদুসহ পাক বাহিনীর সঙ্গে জড়িত রাজাকারদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। স্বাধীনতার পর মানুষ নবরূপে দেশ গঠনে কাজ করে। প্রিতমের বন্ধুরা বিভিন্ন ভাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করে সংসার জীবন যাপন করছে। প্রিতম স্কুলে শিক্ষকতা করে জীবন যাপন করছে, সে আজও সংসার করেনি। প্রিয়তার স্মৃতি নিয়ে, একাত্তরের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের এই ৫২ বছর অতিক্রান্ত হবার পর জীবনের শেষ লগ্নে এসে প্রিতম বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছুটা হতাশাগ্রন্থ। বাংলাদেশের সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন। যে সব রাজাকার দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল তারা আবার এদেশে এসে প্রকাশ্যে জীবন যাপন করছে। এদের বিরুদ্ধে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
আজ পত্রিকা খুলে একটা খবর পড়ে সে কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। খবরটা এ রকম মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এক নেতার স্থাপনকৃত একটি রাস্তার ভিত্তি প্রস্থরের নামফলক ভেঙ্গে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী এবং এক মুক্তিযোদ্ধার নামে তারা রাস্তাটির নামকরণ করেছে।
জনগণের দিনবদলের এই চেষ্টায় প্রিতম আনন্দিত হয়। সে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে। বাংলার আকাশে উঠেছে নতুন সূর্য। সে আকাশের দিকে তাকায়, আকাশের রং কালো ঘোলাটে নয় বরং তাকে মুগ্ধ করে আকাশের নীল রং।


