নাসরীন মুস্তাফা
মাঝি, যাবানি আমার লগে?
ছোটবেলায় শুভ এই প্রশ্নটি শুনলেই লাফিয়ে উঠত। সব সময় ‘ও শুভ’ বলে ডাকত মাঝি। কেবল বেড়াতে যাওয়ার সময় ওকে মাঝি বানিয়ে ফেলাতে ওর যে কী আনন্দ লাগত! মাঝির ডাক শুনলেই মনে হতো, ট্রেনের কু ঝিক ঝিক নয়তো লঞ্চের ভেঁপু, নিদেনপক্ষে রিকশার টুংটাং। বেড়াতে যাওয়া মানেই বই পড়তে হবে না। আকাশ দেখো। রোদের গন্ধ নাও। টুকটুক গল্প করো। অহেতুক হাসো।
বড় হয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ পড়ে প্রশ্নটা শুধরে দিতে চেয়েছিল শুভ। বলতে হবে, আমারে নিবা মাঝি লগে?
মাঝির লগে আমি যাই? না মাঝি আমার লগে যায়?
আসলেই তো! শুভ তো কুবের মাঝি হয়ে কপিলাকে নিয়ে যায়নি ময়না দ্বীপে। শুভর কপিলাই কুবের মাঝিকে নিয়ে যেত। যেখানেই যেত, তা সে বড় চাচার ঢাকার বাড়ি হোক আর দক্ষিণ পাড়ার রিদু পিসির নতুন বিয়েনো গাই দেখতে গোয়াল ঘর, তা তো শুভর ময়না দ্বীপই ছিল।
মাঝবয়সি শুভ এখন ছেলেমেয়ের বাপ। অফিসে মিটিং করে চেয়ার হয়ে। ফোন ধরেই গম্ভীর স্বরে বলে, শুভ চৌধুরী স্পিকিং। ওপাশ থেকে যখন বহু বহু বছর পর ভেসে এলো সেই প্রশ্ন, শুভ চোয়াল ঝুলিয়ে ধসে গেল একেবারে। চেয়ারে বসে পতন ঠেকায়। আনন্দে লাফিয়ে ওঠা হয় না। সম্ভব না।
তীব্র শ্বাসকষ্টে কথাগুলো স্পষ্ট না হলেও শুভ শুনেছে ঠিকই। মাঝি, যাবানি আমার লগে?
ছোট চাচা বলছিলেন, ওকে খুব দেখতে চাইছেন। ওর যাওয়া উচিত। ভয়ের কী আছে? গেরামের মানুষের করোনা হয় না। দাদিরও করোনা হয়নি। জ্বর-কাশিই তো। বয়স বেশি বলে অবস্থা খারাপ।
ছোট চাচা নিজেও কাশছিলেন। শুভ পরের দুই দিন বারবার ফোন করে অনুনয় করেছে দাদিকে হাসপাতালে নিতে, কাজ হয়নি। বারবার মনে মনে ছুটে গেছে নিজে। কুবের মাঝি হয়ে কপিলাকে নিয়ে গেছে হাসপাতালে। অক্সিজেন দিয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে আবদার করেছে, আমারে মাঝি কও!
শুভ যেতে পারেনি। করোনাভাইরাস রাক্ষুসী হিড়িম্বার মতো শাসিয়ে বলেছে, তোকে খাব! এরপর তোর বউ-ছেলেমেয়ে খাব! সাহস কত দেখি তোর! আয় একবার কাছে!
দাদির চলে যাওয়ার খবর দিয়ে ফোনের ওপাশে কাঁদছিলেন ছোট চাচি। ছোট চাচা হাসপাতালে। করোনা ধরা পড়েছে। কাশির দমকে চাচিরও আর কথা চলে না। শুভও শুনতে চায়নি কিছু। ফালতু মাঝি ও! কেবলি মনে হচ্ছে, ময়না দ্বীপের দিকে নাও ভাসছে এক, কেবলি একা কপিলাকে নিয়ে।
কপিলা একা!
কী ভয়ানক একা হয়ে গেল মাঝিও!


