রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

ভজন সরকারের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস’ চন্দ্রমুখী জানালা’ || পর্ব-০৬

ছয়
মৃত্যুরও তর সয় না যুদ্ধকালে

মা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দেশে যুদ্ধ চলছে। বর্ষাকাল। যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা। বিপদে আপদে হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। গ্রামের হোমিওপ্যাথ জিতেন ডাক্তারই অগত্যার ভরসা। কিংবা তেরশ্রীর এলএমএফ ডাক্তার লোকমান হাকিম। তাছাড়া ঠাকুমায়েরও অগাধ সাহস এবং অভিজ্ঞতা। বাবাসহ নয় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ঠাকুমা। তারপরে সাত-সাতটি ছেলের বউদের সন্তান তো হচ্ছেই বাড়িতে প্রতি বছরই দুএকজন করে। বাবা তাই তাঁর মা ও বৌদিদের উপর ভরসা করেই একরকম নির্ভাবনায় থাকেন। রাতে ঘুমের সময় একবার হয়ত জিজ্ঞেস করেন, “তোমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? ডাক্তার লোকমান ভাইকে একবার নৌকা পাঠিয়ে নিয়ে আসি?”

মা সারাদিন কাটিয়ে দেন বই পড়ে আর রেডিও শুনে। অসুবিধে থাকলেও মুখ বুজে সব সহ্য করেন। বাবার কথার উত্তরে বলেন, “না, দিদিরা তো আছে। তাছাড়া মাকেও মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করি খারাপ লাগলে।”

একান্নবর্তী পরিবার। ছেলেমেয়েসহ মোট ত্রিশ পঁয়ত্রিশ জনের খাবারের যোগাড়আত্তি করতে হয় প্রতিবেলা। এক জেঠিমার ভাই তার দুজন সোমত্ত মেয়েকে নিরাপদ ভেবে পাঠিয়ে দিয়েছে এখানে। বাবার এক চিরকুমার কাকা তখন মরণাপন্ন। তাছাড়া একান্নবর্তী পরিবারের নানাবিধ সাংসারিক জটিলতা তো আছেই। সেবার আউশ ও পাটের ফলনও হয়েছিল খুব ভালো। যুদ্ধের ফলে জ্যাঠামশাইদের ব্যবসায়ের টানটান অবস্থা জমিতে ভালো ফলনের জন্য পুষিয়ে গেল। তাই অন্যান্য বছর বর্ষাকালে সংসার নির্বাহের যে চিন্তা থাকে এবারে সেটা আর নেই। জলেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে প্রচুর। বাড়ির সামনের খালে প্রতি বছরের মতো সেবারও কার্তিক হালদার ভেসাল জাল দিয়েছে। প্রতিদিন বিকেলেই বাড়ি যাওয়ার আগে বাড়িতে একটু থামে আর জ্যেঠাদের বলে, “দাদা, এবার এত মাছ ভগবান দিয়েছে যে ভাবতে পারি না। এবার মাছের দাম একটু কম। কিন্তু যে মাছ – পাচ্ছি, সেটাতে দাম পুষিয়ে যাচ্ছে।”

নৌকার তলা দেখিয়ে বলে, “মাঝে মাঝে এমন একটা ঝাঁক আসে যে, পা দিয়ে ঠেলে জাল উপরে ওঠাতে পারি না। আর মাছের এত তেল আগে কখনও দেখিনি, দাদা। থাকবেই না কেন, ধলেশ্বরী দিয়ে তো কলা গাছের মতো মানুষের লাশ ভেসে যায়। মরা মানুষের চর্বি আর পচা লাশ খেয়ে খেয়ে মাছের যে বিশাল সাইজ এবার।”

শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে বাবার ছোট কাকা, মানে ছোট দাদু মারা গেলেন। ছোটবেলায় রোগে পা দুটো শুকিয়ে কাঠির মতো হয়ে গিয়েছিল ছোট দাদুর। সারাজীবন লাঠির উপর ভর দিয়েই চলাফেরা করে গেলেন। বিয়েথা করলেন না। ভাতিজাদের সংসারেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন। বাড়ির দক্ষিণ দিকে নারকেল আর কড়ুই গাছের মাঝখানে জলের পুরানো টিউবওয়েল। টিউবওয়েলের গা লাগোয়া বৈঠক ঘর, যাকে কাছারি ঘর বলে সবাই। সে বিশাল কাছারী ঘরের এক পাশে ছোট দাদুর ঘর। শেষদিকে আর চলাফেরা বিশেষ করতে পারতেন না। ধরে ধরে পায়খানা-প্রস্রাব করাতে হতো। মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হতো। বিছানার পাশে থাকা লাঠিটাই এক সময়ে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল ছোট দাদুর। একদিন সকালে সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন ।

চারদিকে থমথমে অবস্থা। সকাল-সন্ধ্যা-রাত সব সময় এক উৎকণ্ঠায় কাটে। সবার চোখ প্রায় সময়েই থাকে দক্ষিণ দিকে। নিমাই বিলে কোনো বড় নৌকা দেখলেই সবাই ভয়ে আঁতকে ওঠে। এই বুঝি পাকিস্তানি মিলিটারিকে গ্রামে নিয়ে এলো রাজাকারেরা। বর্ষা এসেছে মাত্র মাসখানেকের বেশি হলো। তাই লঞ্চ নিয়ে এখনো মিলিটারি আসবে না; যদি লঞ্চের প্রোপেলার কোনো কিছুতে আটকে যায় সে ভয়ে? তাই ভয় শুধু বড় বড় ছইওয়ালা নৌকায় ।

ছোটদাদুর মৃত্যুতে বাড়িতে সবাই শোকে মূহ্যমান কিন্তু কান্নার রোল নেই । অনেকে আবার হাঁফ ছাড়লেন এ ভেবে যে, বাড়িতে মিলিটারি আগুন দিলে সবাই পালাতে পারলেও ছোট দাদু কোথায় যাবেন? তাকে হয়তো বা ঘরের মধ্যেই পুড়ে মরতে হতো। তার চেয়ে ভগবান নিজ হাতে নিয়ে নিলেন সেটাই ভালো হলো!

ছোটদাদুর মরদেহ নিয়ে মুশকিলে পড়া গেল। গ্রামের শ্মশানটা জলে প্রায় তলিয়ে গেছে। একটু ঠিবির মতো জায়গা তখনো জেগে আছে। কিন্তু যুদ্ধের এ অবস্থায় ছোট দাদুকে সৎকার করতে কেউ সাহসী হলো না। চিতার আগুন যদি পাকিস্তানি মিলিটারিকে হিন্দুগ্রাম চিনিয়ে দেয়?

বাবা মৃদু আপত্তি করলেন, “পাকিস্তানি মিলিটারি কী আর চিতার আগুন দেখে চিনবে কোনটা হিন্দু গ্রাম? শুনেছি শওকত চেয়ারম্যান থানায় গিয়ে হিন্দু গ্রামগুলোর নাম-ঠিকানা দিয়ে এসেছে। কোন বাড়ির ছেলেরা মুক্তিবাহিনীতে গেছে, কোন বাড়িতে যুবতী বউঝি আছে সব তথ্য এখন থানায়। যাই হোক, তোমরা পুড়াতে না চাইলে, না পুড়াবে। তবে কাকার মৃতদেহকে তো কোথাও পুঁতে রাখতে হবে?”

বড় জোঠামশাই বললেন, “নৌকা করে ধলেশ্বরীতে নামিয়ে রেখে আসি কাকাকে । গঙ্গামার শরীরেই বিলীন হয়ে থাকুক।”

পাটের চটের বস্তায় বড় একটা মশলা বাটার পাথরের পাটা ভরে পদ্মা গলুইওয়ালা ছিপ নৌকায় তোলা হলো। শাস্ত্রমতে বাড়ির ঘাটে বড় জোঠা মুখাগ্নি করলেন ছোটদাদুর। তারপর চাঁটাই দিয়ে মুড়িয়ে নৌকার পাটাতনের নিচে লম্বা করে শুইয়ে দেয়া হলো। উপরে কাঠের পাটাতন বিছিয়ে কয়েকটা পাটের গাইটও তোলা হলো। যেন সবাই ভাবে, ব্যাপারী নৌকা তরা হাটে যাচ্ছে পাট বেচতে।

ছোটদাদুর মৃতদেহ ধলেশ্বরী নদীতে চটের বস্তার সাথে বেধে নামিয়ে দেয়া হলো স্রোত দেখে মাঝ নদীতে। মরদেহ জলে নামানোর আগে মাথার দিকটা পূর্বদিক করে প্রথমে জলের সমান্তরাল করে রাখা হলো। তারপর ভারী চটের বস্ত টো জলের মধ্যে ছেড়ে দিল মন্টু। বাঁশের চাটাইয়ে জড়ানো ছোট দাদুর দেহ ধলেশ্বরীর জলে সোজা তলিয়ে গেল। বাঁশের চাটাই থেকে কয়েকটা জলের বুদবু উঠে ঢেউয়ের সাথে মিলিয়ে গেল নিমিষেই।

মেঝজেঠা তার আদরের কাকাকে মাঝ নদীতে ছেড়ে দেয়ার সময় হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বাকি সবাই ক্ষীণস্বরে “হরিবোল হরিবোল, বলো হরি, বলো হরি” করতে করতে নৌকা গ্রামের দিকে নিয়ে এলো। প্রায় নিরবেই ছোট দাদুর অস্তিত্ব সংসার থেকে নেই হয়ে গেল সেদিন। পাড়ার কিছু মানুষ ছাড়া গ্রামের অধিকাংশ মানুষই জানলোই না, বাড়ির ল্যাংড়া-খোড়া সে বুড়োটা আর নেই।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা