পংকজ পাল
নৌকা নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। এছাড়া পণ্য পরিবহণ ও জেলেদের মাছ ধরার কাজেও নৌকার ব্যবহার হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে সবচেয়ে পরিচিত নৌকার নাম হচ্ছে ডিঙ্গি বা ডুঙ্গা ৷ নদীর তীরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা বাস করেন তারা সকলেই এই নৌকা ব্যবহার করেন নদী পারাপার বা অন্যান্য কাজে। আকারে ছোট বলে এই নৌকাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ৷ বাংলাদেশে বর্ষাকালে এর প্রচুর ব্যবহার হয়।
মানিকগঞ্জের মধ্য দিয়ে পদ্মা, যমুনা,ধলেশ্বরী, ইছামতী ও কালীগঙ্গা নদী প্রবাহিত ৷ নদীর পানি মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করলেই নদী তীরবর্তী অঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল দ্রুতই তলিয়ে যায়। গ্রামের চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করে। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায় এবং ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বেশি বর্ষায় পানি জমে বাড়ির আঙিনায় ৷ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে ও যাতায়াতের সহজ বাহন হয়ে ওঠে নৌকা। আবার এই সময়টাতে অনেকেই মাছ ধরে পুরোদমে ৷ এই সময়ে নৌকা ছাড়া জীবন চলেই না ৷
মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও সাটুরিয়া উপজেলাগুলি নদী তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল হওয়ায় এসব এলাকার প্রতিটি পরিবারেই নৌকা যোগাযোগের অপরিহার্য মাধ্যম।
এই প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই বর্ষার আগমনের সাথে সাথেই প্রতিবছর মানিকগঞ্জের ঘিওরে বসে নৌকার হাট। প্রতি বুধবার ঘিওর সরকারি কলেজ সংলগ্ন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে বসে এ হাট। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ হাটে শত শত নৌকা বিক্রি হয় আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠে ঐতিহ্যবাহী এই হাট।
লেখক,গবেষক ও বীরমুক্তিযোদ্ধা অজয় কুমার রায় বলেন—’নৌকা হাটটি প্রথমে ছিলো নদী তীরবর্তী কুস্তা মহাশ্মশানের পাশে ৷ সেই হাট ছিলো বহু প্রাচীন ৷ সেখানে বড় বড় গজারিসহ বিভিন্ন কাঠের টুকরো আর নৌকা বেচা-কেনা হতো ৷ পরবর্তীতে বর্তমান স্থানে হাটটি স্থানান্তরিত করা হয় ৷ গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বর্তমান এই হাটে নৌকা বেচা-কেনা হয়ে আসছে ৷ মানিকগঞ্জ ছাড়াও মানিকগঞ্জের পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইলের নাগরপুর, ঢাকার সাভার ও সিরাজগঞ্জ থেকেও শত শত নৌকা আসে এই হাটে। প্রচুর নৌকা বিক্রি হয় ৷ এ সময় বহু লোকজনের সমাগম ঘটে ৷ নৌকা ক্রয় বিক্রয়ের বিষয়টি প্রাচীন ঘিওর হাটের সুনাম বৃদ্ধির পাশাপাশি এর ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে ৷’
ঘিওর সরকারি কলেজ সংলগ্ন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ভাবে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন সাইজের নৌকা। সকল ধরনের ক্রেতার জন্যই রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নৌকা ৷
নদীগুলোতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। আর এ জন্য নিম্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে নৌকার হাটে আসতে শুরু করেছে। মহামারি করোনার জন্য অনেকেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনা-বেচা করছে ৷
নৌকার সাথে অনেকেরই জীবন জীবিকা জড়িত ৷ বর্ষা এলেই ধুমধাম শব্দ হয় মিস্ত্রিপাড়ায়। বর্ষা মৌসুম শুরুর কিছু আগে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে তারা নৌকা তৈরি শুরু করেন এবং ভাদ্র মাস পর্যন্ত চলে। বর্তমানে ছোট ডিঙি ও কোষা নৌকার কদর বেশি। কড়ই, জাম্বল, আম, কদম, মেহগনি, চাম্বল, রেইন ট্রি কাঠের নৌকা বেশি চলে।
আকার ও মানভেদে প্রতিটি নৌকা বিক্রি হয় ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা ৷ হাটের দিন গড়ে ৩০০-৪০০ নৌকা বিক্রি হয়ে থাকে ৷
তবে এ বছর বর্ষা না হওয়াতে প্রভাব পড়েছে নৌকার হাটেও ৷ বিক্রেতা ও কাঠ মিস্ত্রিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর লোহা-লস্কর আর কাঠের দাম বৃদ্ধি থাকায় নৌকা তৈরিতে খরচ হয়েছে বেশি ৷ তাই বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে ৷ অপর দিকে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি আর বর্ষার জল না আসাতে ক্রেতাদের মনে নেই আনন্দ ৷ কামাই রুজিও কম ৷ তাদের অভিযোগ,গত বছরের তুলনায় এবার নৌকার দাম বেশি।
দাম বেশি হওয়ায় বেচা-কেনা অন্যান্য বছরের তুলনায় কম ৷
দৌলতপুর থানার ধামশ্বর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য চাঁন মিয়া বলেন—’বর্ষা এলে নৌকা ছাড়া আমাদের চলে না ৷ তাই নৌকা কিনতে এসেছি ৷ ঘিওর হাটে পছন্দমতো নৌকা পাওয়া যায় ৷ অনেক নৌকা থেকে পছন্দমতো নৌকা সহজে কেনা যায় ৷’
লেখক: শিক্ষক ও লোক সংস্কৃতি গবেষক ৷


