শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

গাছ ও প্রকৃতির পদ্য || ভজন সরকার

গাছ ও প্রকৃতির পদ্য
মাঝে খুব অস্থির লাগে। জানি না, “অস্থিরতার সূত্র কোথায়?” ঘর-দোর জানালা-কপাট ভেঙে বেড়িয়ে পড়ি। বাড়ির সামনেই এক চিলতে সবুজ। সবুজের ভিতর  ব’হে চলে এক সুক্ষ্ণস্রোতা জল। না ঝর্ণা, না নদী। শব্দ নেই। পাথর নেই যে, পাথর পেতে পা ডুবিয়ে পায়ে পা ঘষবে কেউ। জলের কাছে কেউ কোনদিন গিয়েছিল কোন কস্মিনকালেও? চিহ্ন নেই সে পায়েরও।তবু সে ক্ষীণস্বিনী জলের না-শব্দ না-নিরবতায় অস্থির হই। জানি না, এ অস্থিরতার সূত্র কোথায়? তবু এখানেও সেই অস্থিরতা যে আমাকে অস্থির করে ঘর থেকে টেনে আনে এখানে। ভেবেছিলাম, পা-ডুবিয়ে বসে থাকা কোন রমণীর হঠাৎ-জলে দুঃখডুবানোর মতো আমিও শান্তিতে স্নান করবো। অথচ এখানে এই এক চিলতে সবুজের প্রপাতে কেউ স্নান করে না। স্নান করেনি কেউ কোনদিন তার ইছামতি  আর আমার ধলেশ্বরীর কাজলাজলের ঘাটের রমনীদের মতো।

আমি আবার একলা হই। আবার বেড়িয়ে পড়ি। ক্ষীণ এ জলধারা এক সময় পাহাড় অতিক্রম করে। গড়িয়ে পড়ে শ্যাওলাপাথর চুঁইয়ে। খুব অস্থির এ জলপ্রপাত, ঠিক আমারই মতো। নদী খুঁজতে খুঁজতে সে খুব কাছে এখন নদীর। না-শব্দ না-নিরবতায় হঠাৎ কান পাতলে শব্দের গন্ধ। এ যেন আরেক অস্থির আমি।

অদেখায় অস্থির হ’তে হ’তে কেমন চোখ বুজে কান পাতলেই গন্ধ আর শব্দের মিশ্রণ- কোন্ কালের কোনো  চোখ গড়ানো জলের মতোই ভালোবাসা জমে জমে নোনতা। কিন্তু তবুও মন ভরে না বাড়ির সামনের এক চিলতে সবুজের; নদীর গন্ধ অথচ নদী নেই। নদী খুঁজতে বেড়ানো এক চিলতে সবুজ প্রপাতের সাথে সাথে আমিও একলা হই; আমিও বেড়িয়ে পড়ি তার সাথেই একাকী।

অরণ্য শেষ হয়; ক্ষীণ জলের স্রোতও। শেষ হয় পাহাড়ের গা-চুঁয়ানো। নদীর গন্ধ পায় এক চিলতে সবুজের প্রপাত, নদীর দেখা পায় না।

অবশেষে সব কিছু ছাড়িয়ে দেখা পায় যার; তার নাম শহর। শহরে শুধু গলি। গলির মোড়ে নদী নেই, গলির মোড়ে পাহাড় নেই; গলির মোড়ে নেই অরণ্যও। এক চিলতে সবুজের প্রপাত এবার খুঁজে পায় আকাশ, গলির ঘরে শুয়ে থাকা আকাশ। এখন কী শান্তিতে পা-দুখান ছড়িয়ে আকাশ দেখে সে। আহা আকাশ! যেন এতদিন আকাশের দেখাই মেলেনি!

অস্থিরতার সূত্র খুঁজতে খুঁজতে নদীর বদলে শহর মেলে ক্ষীণস্বিনী জলের। অস্থিরতার সূত্র খুঁজতে আমিও ইছামতি পই পই করি, গড়াইও। পদ্মার জলে ক্ষুদ্র ধলেশ্বরী হারিয়েই যাবে, সে ভয়ে আর ওমুখো হই না। স্নান করি না নদীর ঘাটে পা-ডুবানো রমণীর সাথেও শান্তিতে।

অথচ এখনও “এখানে সেই অস্থিরতা, নবজাতক, বারুদগন্ধ?”। অথচ এখনও সেই ফেলে আসা আকাশের দেখা শহরের গলিঘরে শুয়ে শুয়ে!

আর একবার এক গহিন অরণ্যে ঢুকেছিলাম। হয়ত চেতনে কিংবা অবচেতনেও।  অসংখ্য গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে সরু এক পায়ে চলার পথ। এ রকম পথ খুব একটা বিরল নয় কোনো জায়গাতেই; অন্তত সভ্য মানুষদের বাস আছে যেখানে।

সেদিনই লিখেছিলাম একটি কবিতা। কবিতাটি লেখার পেছনের কাহিনিটা বলে নিলে কবিতাটি বুঝতে সহজ হবে। যদিও কবিতা যে বুঝতেই হবে এরকমটি নাকি কথা নেই? তবে কবিতা বুঝি না-বুঝি ক্ষতি নেই। কিন্তু কবিতার পেছনের ভালোলাগার আবহটি যদি পাঠককে নাড়া না দেয় তবে সেটা কি পাঠকের প্রতি সুবিচার হবে?

আজ গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর যুগে এ কথাটি তো সত্য যে, সভ্যতার পরিমাপক অন্যান্য সূচকের মধ্যে প্রকৃতির অবস্থানটিও নিশ্চিত হয়েছে। তাই বলছিলাম, যে কোনো ছোটখাঁটো বনবাদারেও যেন এ রকমটি সরু পথের দেখা মেলে।  তবে যেটা বিরল সেটা হলো, বনের নিবিড়-সান্নিধ্য।  গাছগুলোর পাতাগুল্ম এমনভাবে চারিদিক আঁকড়ে ছিল যে,পথটিকে মনে হয় বইয়ের পাতায় সেঁটে থাকা অসংখ্য শব্দের একটি লম্বা লাইন। সে লম্বা লাইন দিয়ে যদিও সেদিন খুব বেশি দূর যেতে পারিনি সংগে থাকা মানুষটির জন্য। কিন্তু মনের ভিতরে একটি স্থায়ী দাগ অবশ্যই কেটেছিল সেদিন। তা না হলে গাছ নিয়ে কবিতার এ ধারণাটা কিভাবে এলো?

“এখানে গাছেরা কবিতা পড়ে
এখানে কবিতা গাছেদের নিয়ে গড়া
এখানে কবিতা ও গাছে জড়াজড়ি করে
এখানে কবিতা পড়াই যেন গাছেদের পড়া|”

যদিও এখানে সেদিনের দেখা সে পথটির কথা সরাসরি নেই। কিন্তু কবিতাটি তো আছে। অর্থাৎ গাছেদের মধ্যে দিয়ে চলা সরু পথটি কবিতা হয়ে গেছে।  আর সে পথ অর্থাৎ কবিতা আর গাছ জড়াজড়ি করে এমনভাবে আছে যেন, কবিতা ও গাছ যেন সম্পূরক। একজনকে পড়লেই অন্যকে পড়া হয়ে যায়; ঠিকঠাক দিকে ও পরিমাপে। এককথায় গাণিতিক ‘ভেক্টর’ সমতায়।

এ পর্যন্ত লিখেই কবিতাটি রেখেছিলাম সেদিন। হয়ত আর অধিক লেখার ইচ্ছে বা রসদ কিছুই ছিল না। কিন্তু এক বন্ধু “মৌন বোধীবৃক্ষ”-এর উপমা দিল একদিন। আর এ উপমাটি  আমাকে আরও টেনে নিয়ে চলল কবিতার পথ ধরে।

যাঁরা ‘বোধীবৃক্ষ’ জানেন না, তাঁদের জন্য উদ্ধৃতি দিচ্ছিঃ

“বোধিবৃক্ষ হল ভারতের বুদ্ধগয়ার অবস্থিত  একটি অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার তলায় ধ্যান করে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক সিদ্ধার্থ গৌতম বোধিলাভ করে বুদ্ধ হয়েছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় ‘বোধি’ শব্দের অর্থ ‘জ্ঞান’। ধর্মীয়মতে, বোধিবৃক্ষ তার হৃদয়াকৃতির পাতা দ্বারা সহজেই চেনা যায়। গৌতম বুদ্ধ পঁয়তিরিশ বছর বয়সে,বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে পূর্বদিকে মুখ করে সুজাতার দেওয়া পায়েসান্ন ঊনপঞ্চাশ গ্রাসে গ্রহণ করে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করার মানস নিয়ে যে অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন তাকেই বলা হয় বোধিদ্রুম বা বোধিবৃক্ষ। “

আমি মহামতি বুদ্ধের মতো ধ্যানমগ্ন না হয়েই লিখলাম আরও কিছু লাইনঃ

“এখানে কবির হাত ধরে যাই গাছেদের বাড়ি
এখানে কবির ঠোঁট রাঙে গাছের সবুজে
এখানে গাছে-মানুষে যেন কবিতার আঁড়ি
এখানে কখনও গাছ হয়ে যায় কবিতাই নিজে|”

কার হাত ধরে সেদিন জঙ্গলের সরু পথে গিয়েছিলাম? সংগে এক কবি ছিলেন। এখনো ভাবি আসলে  বাস্তবে ছিলেন কি কেউ? হয়ত মননে তো ছিলেনই।

সবুজে মোড়ানো ছিল তাঁর শরীর। সবুজে রাঙা ছিল তাঁর ঠোঁট। সবুজ ছিল তাঁর মন; প্রকৃতিপ্রেমীদের যেরকমটি থাকে। কবিরা কেন তার ব্যতিক্রম হবেন? আমার সংগে থাকা কবিও ছিলেন না ব্যতিক্রম অবশ্যই।

তাই গাছকে নিয়ে কবিতা লেখার এক ঔৎসুক্য প্রতিযোগীতা ছিল আমাদের মধ্যে সেদিন। আর সে কবিসত্বার আবির্ভাবে প্রত্যেকটি গাছ যেন হয়ে উঠেছিল নিজেই কবিতা।

এ পর্যন্তই থেমে যাওয়া যেত। কিন্তু হঠাৎ সূর্য মাথার ওপর গড়িয়ে পড়ল। তীব্র রোদে গাছেদের ছায়ায় আশ্রয় নিতে হলো আমাদের। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, ছায়ারা সরে যাচ্ছে দূরে। আবার ক্ষণিক পরেই একেবারে গা ঘেষে দাঁড়াচ্ছে। গাছের নিচে ছায়াদের এ নাচ যেন সমস্ত জঙ্গল জুড়েই।

আক্ষরিক অর্থে হয়ত বাতাসে নাচতে থাকা ছায়াদের সাথে তাল মেলানো সম্ভব ছিল না সেদিন। কিন্তু মনের ভিতরে আটকে থাকা কল্পনারা থেমে থাকবে কেন? অজান্তেই বের হয়ে এলো কবিতার বাকী চারটি পংক্তি এভাবেই ,

“এখানে সারাদিন বাজে কবিতার সুর
শুনশান যেন কবিতা কোলাজে
এখানে গাছেদের নীচে ছায়ার নূপুর
নাচ করে এসে কবিরাই নিজে । ”

কবিরা হয়ত একদিন গাছেদের ছায়ার তলে নেচেছিলেন কিংবা এখনও নাচেন। কিন্তু শুধু কবিদের নাচেই কি ক্ষয়িষ্ণু গাছেদেরকে রক্ষা করা যাবে? পৃথিবীর মানুষ ও সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে এখনই বাঁচাতে হবে গাছগাছালি, বনবাদার এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এখন আর কোন শ্লোগান নয়।

আমাদের আত্মজ উত্তর-প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া একটি সুন্দর ব্রহ্মান্ডের অপরিহার্য উপাদান চারপাশের গাছপালা-নদী-পাহাড়।  এই প্রকৃতিকে  বাঁচিয়ে রাখতে কবিতার মত করেই ভালোবাসতে হবে পরম মমতায়।

পুরো কবিতাটি এখানে দিই এবারঃ

এখানে গাছেরা কবিতা পড়ে
এখানে কবিতা গাছেদের নিয়ে গড়া
এখানে কবিতা ও গাছে জড়াজড়ি করে
এখানে কবিতা পড়াই যেন গাছেদের পড়া।

এখানে কবির হাত ধরে যাই গাছেদের বাড়ি
এখানে কবির ঠোঁট রাঙে গাছের সবুজে
এখানে গাছে-মানুষে যেন কবিতার আঁড়ি
এখানে কখনও গাছ হয়ে যায় কবিতাই নিজে।

এখানে সারাদিন বাজে কবিতার সুর
সুনসান যেন কবিতা কোলাজে
এখানে গাছেদের নীচে ছায়ার নূপুর
নাচ করে এসে কবিরাই নিজে।

লেখক পরিচিতি

ভজন সরকার
ভজন সরকার
ভজন সরকারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের মামাবাড়িতে । বেড়ে উঠেছেন মানিকগঞ্জ জেলার পশ্চিমের জনপদে ।বাবা-মা দু’জনেই স্কুল শিক্ষক । ভজন সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনে। তারপর ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এবং কানাডার উইন্ডসর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পুনরায় স্নাতক এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কানাডায় স্থানীয় সরকারী সংস্থায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে। বর্তমানে সিটি অব হ্যামিল্টনের ৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত। প্রথম বই ‘বিভক্তির সাতকাহন’ ‘মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে আলোড়িত এবং আলোচিত সবমহলেই। প্রধানত কবি হ’লেও লিখছেন নিবন্ধ, কলাম ও উপন্যাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হ’লোঃ বিভক্তির সাতকাহন ( প্রবন্ধ)- মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী; ক্যানভাসে বেহুলার জল ( কাব্য)- নন্দিতা প্রকাশ; বাঁশে প্রবাসে ( প্রবন্ধ রম্যরচনা)- নন্দিতা প্রকাশ ; রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বসবাস (প্রবন্ধ)- নন্দিতা প্রকাশ; চন্দ্রমুখী জানালা ( উপন্যাস) - নন্দিতা প্রকাশ ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা