থেকে যাও সন্ধ্যাতারার মতন
[ রিপোর্ট হাতে হসপিটাল থেকে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সায়ন্তন।]
শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ৷
ক্ষয়প্রাপ্ত ক্ষণস্থায়ী জীবন থেকে এবার মুক্তি দেবার পালা প্রেয়সীকে। বিশ্বাসঘাতক অমানুষের তকমা গায়ে মেখেই না হয় কেটে যাক বাকী দিনগুলো।
তবুও চরম নির্মম সত্যিটা না জানুক সে –
যোগাযোগহীন ছ’মাস পরে হঠাৎ দেখা পার্ক স্ট্রিটের বেঞ্চিতে। থমকে গেল দুইজোড়া চোখ। জমে থাকা না বলা কত কথার স্তূপ।
সায়ন্তনের হাতে নীল মলাটের একটি বই –
– প্রথম ঝড়ে পড়া শিউলিটা কুড়িয়ে তোমার পায়ে দেব বলে আমি সারারাত শিশিরে ভিজেছি..
– কি পড়ছো?
– কবিতা
– পুরোনো অভ্যাসগুলোকে এখনো কেন আঁকড়ে ধরে আছো?
– এইত বেঁচে থাকার রসদ।
– তুমি তো মুক্তি চেয়েছিলে
– কিছু মোহন শব্দের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমি দেউলিয়া হয়েছি।
আটকে পড়েছি সুতোর টানে।
– আমি তো কোন অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটিনি সায়ন্তন!
– জানি
– শক্ত মাটির কুঁড়েতেই এক ভালবাসার সাম্রাজ্য গড়তে চেয়েছিলাম। শক্তি আর সামর্থ্যের কোন সীমারেখা না ভেঙেই শক্ত করে একটা হাত ধরতে চেয়েছিলাম।
– অনেক কিছু অজানাই রয়ে গেল আর অব্যক্ত রয়ে গেল তার থেকে ও বেশি।
– তুমি খুব ভালো আছো সায়ন্তন । তাই না?
কেউ আর জ্বালায় না তোমায়। মাঝরাতে কেউ আর বলেনা জ্যোৎস্নায় ভিজে গল্প করতে।
– আমি এখনও জ্যোৎস্না গায়ে মেখে সারারাত গল্প করি অর্কিডের আধাফোটা ফুলগুলোর সাথে।
হলুদ ল্যাম্পপোষ্টের আলোয় ফুটপাত ধরে হেটে যাই গন্তব্যহীন।
– কখনো আমার শূন্যতা তোমায় পোড়ায় না?
– এ পোড়া চোখ নতুন করে আর কি পুড়বে!
জানো ঊর্বশী, আমি রোজ রাতে অনর্গল কথা বলে যাই ওই তারাগুলোর সাথে। তোমার অনাগত ভবিষ্যৎের কথা, স্বপ্নের কথা, প্রাপ্তির কথা….
– কেন ভাব আমাকে?
– এই ভাবনাগুলোই এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে আমায় নয়ত কবেই মিশে যেতাম দূর্বাদের দলে।
– আমি সব ভুলে যেতে যাই। স ব টা! কিন্তু অভিশপ্ত স্মৃতিগুলো কুঁড়ে খায় আমায়।
আমি পারিনা সায়ন্তন!
বারবার হারিয়ে যাই স্মৃতির অতলে। অবাধ্য মনের সাথে যাপিত জীবনের কর্ম পাল্লা দিয়ে দিনশেষে হেরে যায়।
তুমি ফিরে এসো সায়ন্তন..
– চাইলেই কি ফেরা যায়?
– গোটা জীবন পরে আছে।
– বিয়োগদলে সময়গুলো মিশে যাচ্ছে নিভৃতে অথচ আমাদের ইচ্ছে আকাঙ্খা কি জাগ্রত!
আচ্ছা ঊর্বশী তুমি কি এখনো সময় পেলে আকাশ দেখো?
– দেখি।
দুচোখ ভরে আকাশ দেখি । অপলক তাকিয়ে থাকি নক্ষত্রগুলির দিকে। হাত বাড়ালেই মনে হয় ওরা ফুলের পাপড়ি হয়ে ঝড়ে পড়ে আমার দুহাতে। আমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের গল্প ওদের জানা।
– নিয়ম করে নক্ষত্রগুলো খসে পড়ে তারপর বিলীন হয়ে যায় মহাশূন্যে। তোমার সকল দুঃখবোধ ও একদিন বিলীন হবে সময়ের স্রোতে।
– সায়ন্তন আমাদের শুরুর গল্পটা কতটা স্বচ্ছ কতটা প্রানবন্ত ছিল তবে শেষটা কেন এত ধোঁয়াশা?
– কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই
– কেন নেই?
– জানিনা
– অবাধ্য নির্লজ্জের মতো কতবার ছুটে গিয়েছি তোমার দুয়ারে এই উত্তর জানার জন্য। কখনো তোমায় পাইনি।
– ঊর্বশী চা খাবে?
– না।
– এখানে ক্যান্টিনের চা অনেক ভালো বানায়।
– তুমি কি আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছো?
– সারাটা জীবন দুঃখের বন্দনা করলে আনন্দকে বঞ্চিত করা হবে।
– সায়ন্তন তুমি খুব বদলে গেছ এই ছ’মাসে।
– যতদিন বেঁচে থাকা যায় বাঁচার মত করে বাঁচা উচিত, আনন্দে বাঁচা উচিত। গোটা জীবন পড়ে আছে তোমার। পুরোনো দুঃখবোধকে আর জায়গা দিও না নিজের জীবনে। নতুন স্বপ্নে বাঁচো।
– আমার আবার স্বপ্ন!
সব স্বপ্ন শকুন্তলার কাব্য হয়ে গেছে। সায়ন্তন আমি তোমার সাথে বাঁচতে চাই, আনন্দে বাঁচতে চাই। আমাকে আর ফিরিয়ে দিও না…
– তুমি আমার সাথে ভালো থাকবে না। সুখী করতে পারব না তোমাকে। অনুর্বর বিদ্ধস্ত মরুর বুকে কখনো নতুন দূর্বা জন্মে না।
– সায়ন্তন…
– নতুন পৃথিবীতে ভালো থাকবে। খুব ভালো।
বলেই সায়ন্তন পা বাড়ালো মৃতপ্রায় একটা শরীর নিয়ে পেছনে ফেল গেল এক সমুদ্র শুদ্ধ ভালবাসা ।
মানুষ চলে যায়
স্মৃতিটুকু থেকে যায়
কথাগুলো থেকে যায়
সন্ধ্যাতারার মতন।


