শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

সাহিত্যিকদের মজার ঘটনা

আসুন পড়ে নেই বিখ্যাত লোকেদের পনেরটি হাসির ঘটনা !

সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই রসিক মানুষ! জীবনের সাধারণ ও বিরক্তিকর ঘটনাগুলোকে হাস্যরসে পরিপূর্ণ করে তোলার ক্ষমতা তাঁদের থাকে। বিখ্যাত লেখকদের জীবনেও আছে এমন কিছু হাসির ঘটনা । চলুন, জেনে আসি-

০১। কঠিন পিঠা

এক মহিলা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য কিছু পিঠা বানিয়ে নিয়ে  যান। কেমন লাগল পিঠা জানতে চাইলে কবি গুরু উত্তর দেন-

‘লৌহ কঠিন, প্রস্তর  কঠিন, আর কঠিন ইষ্টক,

তাহার অধিক কঠিন কন্যা তোমার হাতের পিষ্টক!’

০২। আপদ-বিপদ

ইংরেজ শাসনামলের প্রথম বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়। ম্যাজিস্ট্রেট হতে গিয়ে আর সবার মতো তাকেও ইন্টারভিউর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। স্বভাবতই পরীক্ষক ছিলেন একজন ইংরেজ। ইংরেজ মহাশয় ইন্টারভিউর এক পর্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন,

– হোয়াট ইজ দ্য ডিফারেন্স বিটুইন আফদ (আপদ) অ্যান্ড বিফদ (বিপদ)?

বঙ্কিমচন্দ্র উত্তর দিলেন,

– ধরুন, আমি নৌকায় চড়ে নদী পার হচ্ছি এমন সময় প্রচণ্ড ঝড় উঠল, এটা হচ্ছে বিপদ।  আর এই যে আমি একজন বাঙালি হয়েও ইংরেজের কাছে বাংলার পরীক্ষা দিচ্ছি এটা হচ্ছে আপদ।

০৩। দে

এলাকার অন্যতম ধনী দেব নারায়ন দে’র বাড়িতে একটা বড়সড় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। লেখা হচ্ছিল দেনাপাওনা ও খরচাপাতির ফর্দ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রসিক লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র। খরচের ফর্দ দেখে প্যারীচাঁদ মিত্র বললেন-,

– একি! মিষ্টান্নের জন্য এতো কম টাকা? ব্রাম্মণকেও তো তেমন দেয়া হচ্ছে না। এসব খরচ কিছু বাড়িয়ে দিন।

দেবনারায়ন বললেন,

– প্যারীচাঁদ বাবু, আপনি শুধু খরচ বাড়াতে বলছেন। টাকাটা কে দেবে শুনি?

– কেন? আপনি দেবেন। আপনার নামের আগে দে, নামের পরেও দে। দিতে আপনাকে হবেই।

০৪। চোরের উপর বাটপারি

লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন নামকরা চিত্রপরিচালক। তার নতুন একটা ছবি মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ঐ ছবির কাহিনী নিয়ে কথা উঠেছে! বুদ্ধদেব গুহ পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন যে কাহিনীটি তার, প্রেমেন্দ্র মিত্র যা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। সবাই উদগ্রীব, প্রেমেন্দ্র মিত্র কী বলেন? ক’দিন পর প্রেমেন্দ্র মিত্র বিবৃতি দিলেন। তিনি বললেন,

– চলচ্চিত্রের কাহিনীটি আমার না সেটা সত্যি, তবে বুদ্ধদেব গুহ যেখান থেকে গল্পটি নিয়েছেন- আমিও ঐ একই জায়গা থেকে নিয়েছি।

০৫। মানুষের উপকার

একবার এক ছাত্র মার্ক টোয়েনের কাছে এসে বলল,

– আমি ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়েছি। এখন সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের উপকার করতে চাই।

মার্ক টোয়েন উত্তর দিলেন,

– তুমি ডাক্তারী পড়া ছেড়ে দিয়ে এমনিতেই মানবজাতির অনেক উপকার করেছ। আর উপকার না করলেও চলবে!

০৬। মুখের মতো জুতা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং দীনবন্ধু মিত্র দুজনে ছিলেন পেয়ারা বন্ধু। দীনবন্ধু ডাক বিভাগে কাজ করতেন। আর সে সুবাদে তাকে প্রায়ই ঘুরে বেড়াতে হতো বিভিন্ন অঞ্চলে।

একবার আসামে গিয়ে সেখান থেকে বঙ্কিম এর জন্য কাপড়ের একজোড়া জুতো কিনে এনেছিলেন। লোক মারফত সে উপহার বঙ্কিমের কাছে পাঠিয়েছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে একটা চিরকুটে লিখে দিলেন- ‘জুতো কেমন হয়েছে জানিও।’

বঙ্কিম চিরকুটটি পড়ে হাসলেন। তারপর তার উত্তরে লিখে দিলেন- ‘ঠিক তোমার মুখের মতো!’

০৭। মৃত’র চিঠি

নোবেল বিজয়ী ইংরেজ লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং যে পত্রিকাটির গ্রাহক ছিলেন  সেখানে একবার ভুলবশত কিপলিং এর মৃত্যু সংবাদ ছাপা হল। সংবাদটি পড়ে  তৎক্ষণাৎ কিপলিং পত্রিকা সম্পাদককে চিঠি লিখলেন- আপনার পত্রিকা মারফত জানতে  পারলাম যে আমার মৃত্যু হয়েছে। তাই দয়া করে আপনাদের গ্রাহক তালিকাটা থেকে  আমার নামটি বাদ দিয়ে দিবেন!

০৮। সাজিয়ে রাখা

বিখ্যাত লেখক জর্জ বার্নার্ড শ-র বাড়িতে বেড়াতে এসে এক মহিলা অবাক হয়ে  বললেন,

– মিস্টার শ, আপনার ঘরে দেখছি একটাও ফুলদানি নেই। আমি ভেবেছিলাম, আপনি এত বড় একজন লেখক; আপনি নিশ্চয়ই ফুল ভালবাসেন। তাই আপনার বাসার ফুলদানিতে বাগানের তাজা ও সুন্দর ফুল শোভা পাবে।

প্রত্যুত্তরে শ সঙ্গে  সঙ্গেই বললেন,

– ম্যাডাম, আমি বাচ্চা ছেলেমেয়েদেরকেও ভালবাসি। তার অর্থ এই  নয় যে, আমি তাদের মাথা কেটে নিয়ে এসে ঘরে সাজিয়ে রাখব।

০৯। কাঁদানো

দাঁতের ব্যথায় অস্থির হয়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ডেন্টিষ্টের কাছে গেলেন। ডেন্টিষ্ট দাঁত দেখে বললেন,

– তোমার লেখা পড়ে আমার বৌ কেঁদে ফেলে। এবার দেখ আমি তোমাকে কীভাবে কাঁদাই!

১০। ভূমিকা

জর্জ বার্নার্ড শ একবার এক প্রবন্ধে লিখলেন, ‘বাড়ি হল বালিকাদের জেলখানা আর নারীদের কারখানা’।

এক রসিক পাঠক লেখাটি পড়ে প্রশ্ন করলেন,

– তাহলে একটি বাড়িতে পুরুষের ভূমিকা কী?

বার্নার্ড শ উত্তর দিলেন,

– একই সঙ্গে একজন জেলার আর কারখানার মালিক।

১১। আর্শিবাদ

বিদ্যাসাগর-রচনাসম্ভার সম্পাদনা করার সময় প্রমথনাথ বিশী লিখেছিলেন, ‘ঈশ্বরচন্দ্র কেবল বিদ্যাসাগর বা করুণার সাগর নয়, রসসাগরও বটে।‘

এমনি একদিন এক বিধবার বিয়ে দেয়ার আসরে বিদ্যাসাগর গেছেন। সেখানে তাঁর এক বন্ধুর মেয়ে এসে তাঁকে প্রণাম করলে, তিনি সবাইকে শুনিয়ে বলেন,

– বেঁচে থাকো মা। বিয়ে হোক, বিধবা হও, আমি আবার বিয়ে দিই।

১২। দর্পণ ও মেরুদণ্ড 

নাট্যকার সেলিম আল দীনকে একদল নাট্যকর্মী তাদের নাটক দেখার আমন্ত্রণ-পত্র দিতে এলে তিনি তাদেরর  জিজ্ঞাসা করলেন,

– আচ্ছা তোমরা নাটক কেন করো বলো তো?

– স্যার, নাটক হলো সমাজের দর্পণ।

– নাটক সমাজের দর্পণ! (এই জাতীয় কথায় স্যার বড়ই বিরক্ত হতেন) তা এ কথাটা একটি অথেনটিক বইতে আমাকে তুমি দেখাতে পারো? শোনো, পত্রপত্রিকাও তো সমাজের দর্পণ, তাই না? এমন আরো আছে, বাজারে গেলে সমাজ চেনা যায়। এমন কত না দর্পণ আছে। এক সময় আবার শুনলাম শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আবার শুনলাম তরুণ সমাজ জাতির মেরুদণ্ড, এখন শুনি নারীপ্রগতি জাতির মেরুদণ্ড। এত মেরুদণ্ড নিয়ে একটা জাতি কি হাঁটতে পারে?

১৩। যেমন প্রশ্ন তেমন উত্তর

১৮৬২ সালে প্রকাশিত হয় ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত বই ‘লা মিজারেবল‘। তখন এটি নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। নানা সমালোচক এবং নানা খবর পত্র-পত্রিকায় আসে। কিন্তু সেখান থেকে ভিক্টর হুগো বুঝতে পারলেন না বইটি বিক্রি হচ্ছে কেমন।

অবশেষে তিনি এর উত্তর জানার জন্য প্রকাশককে খুব ক্ষুদ্র একটা চিঠি দিলেন শুধুমাত্র ‘?’লিখে। প্রকাশক ‘?’ এর মানে বুঝতে পারলেন এবং জবাব দিলেন ‘!’।

১৪। মাতালের জবাব

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অর্থিক অনটনের সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনাকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন। একদিন এক মাতাল উনার কাছে সাহায্য চাইতে এলে বিদ্যাসাগর বললেন,

– আমি কোন মাতালকে সাহায্য করি না।

– কিন্তু আপনি যে মধুসুদনকে সাহায্য করেন, তিনিও তো মদ খান, মাতাল।

– ঠিক আছে আমিও তোমাকে মধুসূদনের মত সাহায্য করতে রাজি আছি তবে তুমি তার আগে একটি ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য লিখে আন দেখি?

১৫। ধীরগতির ট্রেন

অনেক বছর আগের কথা। সে সময় আমেরিকান ট্রেনগুলো বেশ ধীরগতিতে চলত। দেরী করত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সকাল ৮টার ট্রেন রাত ৮টায় আসবে কী-না সে বিষয়ে সবাই থাকত সন্দিহান।

এমনই এক সময়ে বিখ্যাত রম্যসাহিত্যিক মার্ক টোয়েন একবার কোথাও যাওয়ার জন্য ট্রেনে চেপে বসে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর কামরায় উঠল টিকিট চেকার। মার্ক টোয়েন গম্ভীর মুখে চেকারের দিকে একটা ‘হাফ টিকিট’ বাড়িয়ে দিলেন। বুড়ো মানুষের হাতে ‘হাফ টিকিট’ দেখে টিকিট চেকার অবাক! তাঁর প্রশ্ন,

– কী মশাই, আপনি হাফ টিকিট কেটেছেন কেন? গোঁফ-মাথার চুল সবই তো সাদা। আপনি কী জানেন না চৌদ্দ বছরের বেশি হলে তার বেলায় আর হাফ টিকিট চলে না?

মার্ক টোয়েনের সোজা জবাব,

– যখন ট্রেনে চড়েছিলাম, তখন তো বয়স চৌদ্দই ছিল। কে জানত, ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছতে এত দেরী করবে!

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা