মানিকগঞ্জের লোকসংস্কৃতি এবং অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্ম চেতনায় সমৃদ্ধ লোকসংগীত : মৃদুল রহমান

আমাদের দেশের প্রায় সব অঞ্চলেরই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি রয়েছে; যেগুলোকে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি নামে অভিহিত করা হয়। আঞ্চলিকতা শব্দটির মূলে অঞ্চলভেদ এবং আঞ্চলিক ভাষার প্রায়োগিক প্রাধান্য পায় । তবে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি নির্দিষ্ট অঞ্চলসমূহে সীমাবদ্ধ বলেই দেশজুড়ে-এর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটছে না । হয়তো সেটা কেবলমাত্র আঞ্চলিক ভাষার কারণেই। ভাষার ভিন্নতাই মানুষকে দূরবর্তী করে তোলে। একমাত্র, কেবল একমাত্র অভিন্ন ভাষাই মানুষকে সহজে নিকটবর্তী করতে পারে,বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়াতে পারে। অঞ্চলভিত্তিক লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি মাতৃভাষায় দেশজুড়ে যে লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ বলয় রয়েছে, সেটাকেই আমরা লোকসংস্কৃতি বলে থাকি। সৃজনশীল বিনোদনে সাহিত্য, শিল্পকলা, নাচ, গান, নাটক ইত্যাদিতে সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে ।  সংস্কৃতি জাতি পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি। সব জাতিসত্তার সংস্কৃতি ভিন্নতারই অপর নাম সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্য থাকতে হবে। বৈচিত্র্যহীন সংস্কৃতি কাম্য হতে পারে না। সংস্কৃতি অটল বা অনড় নয়। সংস্কৃতি বিকাশমান। অপর বা ভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদানে সংস্কৃতি ঋদ্ধ হতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণে সংস্কৃতিতে ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল।

পলিমাটি

শুরুতেই কথাগুলো বলছি এ কারণে যে, ভিনদেশী আকাশ সংস্কৃতি আমাদের আপন সংস্কৃতির প্রতি এতটাই উদাসীন করে ফেলছে যে আদৌ বাঙালি তাদের লোকসংস্কৃতির মাহাত্ম ভুলে গেল কিনা তাই l প্রচলিত লোকসংস্কৃতিকে যদি পেছনের পানে হাঁটা বলা যায়। তবে ভিন দেশি অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ অন্ধভাবে সামনে ছুটে চলা বলা  অযৌক্তিক হবে না বৈকি। আমাদের প্রাণের মানিকগঞ্জ জেলা ব্রান্ডিং হয়েছে -”লোকজ গান আর হাজারী গুড়; মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর” l  সম্প্রতি মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যের প্রতি শিক্ষিত ও শাসকদলের কিঞ্চিত হলেও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কাগুজে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে l আশা রাখতেই পারি,অচিরেই নানা পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে গভীর আন্তরিকতায় l

সমাজ জীবনের সংকট-সমস্যা, জীবনযাত্রার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, লড়াই-সংগ্রাম সবই সংস্কৃতির শৈল্পিক ক্যানভাস। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সব বৈচিত্র্যপূর্ণ আচার সংস্কৃতির অন্তর্গত। সংস্কৃতির সৃজনশীল বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। এসবই সংস্কৃতির বৃত্তের অনিবার্য উপাদান। লোকসংস্কৃতিতে নানা উপাদান রয়েছে; জারি-সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, দেহতত্ত্ব, মরমি, ধর্মাশ্রিত কীর্তন, আধ্যাত্মিক অজস্র উপাদানে আমাদের লোকসংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির সর্বাধিক শক্তিমান মাধ্যমটি হচ্ছে গান। এক কথায়, মানুষের জীবন, সমাজ, ধর্ম, বিশ্বাস আর কাল প্রবাহের গভীরে প্রোথিত শিঁকড় থেকেই সংস্কৃতির জন্ম  এবং বিকাশ। মানিকগঞ্জের সংস্কৃতি ও এর বিকাশও এ সত্যের বাইরে নয়, একই সূত্রে গাঁথা। মানিকগঞ্জ জেলা অর্থনৈতিকভাবে কখনই সমৃদ্ধ ছিল না। তাই বলে  অভাবের তান্ডবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন কখনো  বিপন্নও হয়নি। ফলে কৃষি নির্ভর মানিকগঞ্জের মানুষের মনে কঠিন জীবন বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিলো আধ্যাত্মিকতা। জনমানুষের আধ্যাত্ম চেতনায় সমৃদ্ধ হয়েছে মানিকগঞ্জের লোক সংগীত। ইতিহাস ঐতিহ্য সেই সাথে ভৌগোলিক বৈচিত্রের ধারাবাহিকতায় মানিকগঞ্জের মানুষ মানেই সহজ, সরল, আবেগিক, অতি বন্ধুত্ব ও অতিথিপরায়ন l আছে ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি; মা মাটির মেঠো সুরের প্রতি চিত্ত ব্যাকুলতা I ধর্মান্ধ নয়, তবে লোকাচারের প্রতি কৌতূহল  চোখে পড়ার মতো l

১৩৭৮.৯৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মানিকগঞ্জের প্রতি ইঞ্চি  ভূমি গড়ে উঠেছে পদ্মা, যমুনা, কালীগংগা, ধলেশ্বরী ও ইছামতির পলি-জলের নিবিড় ভালবাসায়। নদী বিধৌত এ জনপদের মানুষের সংস্কৃতিও তাই বিকশিত ও ঋদ্ধ হয়েছে স্বকীয় সত্তায়। এ অঞ্চলের প্রকৃতি, মানুষের ধর্ম, পেশা, লোকাচার, বিশ্বাস, মানিকগঞ্জের সংস্কৃতিকে ভিন্ন মাত্রায় বিকশিত করেছে। এবং এটাই নৃবিজ্ঞান এবং আধুনিক বিজ্ঞানও সমর্থন করে l

মানিকগঞ্জের সংস্কৃতি মুলতঃ বাঙালী সংস্কৃতি। তাই এখানে  ধর্মীয় প্রভাব স্বাভাবিক কারনেই গভীর। এ সংস্কৃতির প্রতিটি গাঁথুনীতেই ধর্মের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্মাচারে বৈষ্ণব এবং সুফী দর্শণের প্রাবল্য এ অঞ্চলের মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মানুষের মধ্যে গড়ে উঠে সহমর্মিতা ও সহনশীলতা। ধর্মীয় বিরোধ এখানে কখনই বড় হয়ে উঠেনি। অসাম্প্রদায়িক এ চেতনা নিয়েই মানিকগঞ্জের হিন্দু ও মুসলমান হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করছে ।

মানিকগঞ্জের মাটি তার বুকে ধারণ করে আছে হাজারো মসজিদ, মন্দির । সন্ধ্যায় তুলশী তলায় পুঁজো আর কাসরঘন্টা যেমন বাজে তেমনি অপার মহিমায় দিগন্ত জুড়ে ধ্বনিত হয় আযানের বাণী, আজো বদলায়নি এ হাওয়া । ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় এ জেলা বরাবরই ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলনভূমি । সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুবাতাসে সুখে-দুঃখে, হাসি-আনন্দে একত্রে কেটেছে অতীতের রাত-দিন । জারি গান, সারি গান, বিচার গান, কবি গান, বাউল গান, মুর্শিদী, মারফতী, গাজীর গান, গাজনের গান, বেহুলার গান, ধুয়া গান, বারোমাসী গীত, মেহেদী তোলার গীত, বিয়ের গীত, ঘেটু গান, মর্সিয়া, পাঁচালী,ওন্নি গান, ব্যাঙ বিয়ের গান ইত্যাদি মানিকগঞ্জের গ্রামীন জীবনের প্রতি পরতে পরতে মিশে  আছে আজো। দুই থেকে তিন যুগ আগেও মানিকগঞ্জের গ্রামীন জনপদের  বাড়ির আঙিনা, মাঠ আর বটের ছায়ায় বসতো লোক সঙ্গীতের প্রাণবন্ত আসর। এ সবের আয়োজন বর্তমানে কমে আসলেও লোক সংগীতের প্রতি নাড়ীর টান কমেনি একটুও।  কীর্তনের ভাব ও সুর মুর্চ্ছনা মানিকগঞ্জের লোক চেতনার মধ্যে আজও বহমান। এসব আসরে ভক্ত মানুষের উপস্থিতি একটুও কমেনি বরং দিন দিন বাড়ছেই। এ শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, রক্ত ধারায় বহমান সংস্কৃতিরই প্রকাশ।

পলিমাটিপুঁথি-পদাবলী, যাত্রাপালার সুর মুর্চ্ছনা, নৌকাবাইচ, গরু দৌড়, মাঘি আর বৈশাখী মেলার মত হাজারো মেলায় মেতেছে মানিকগঞ্জের জনপদ । হ্যাজাক আর কুপি বাতির আলোয় রাতের আসর জমেছে ভাসান যাত্রা, জামাল যাত্রা, দুধ মেহেরের পালায় । হালে বিচার গানের বয়াতি বা শিল্পী মানেই মানিকগঞ্জ নামটি সবার মুখে মুখে l কারণ আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী লোক সংগীত শিল্পী মমতাজ বেগমের সংগীত উৎস ঐ বিচার গান ছিল বলে l আনন্দ ও গৌরবের বিষয় হচ্ছে, শিল্পী মমতাজের অন্যান্য অনেক পরিচয় তার জীবনকে সম্মানিত করলেও সংগীতের প্রতি তার নিগূঢ় ভালোবাসা ও মহিমা তিনি ভুলেন নি l তাইতো মানিকগঞ্জের লোক সংগীত ধারায় একটা অভিভাবকত্বের জায়গা শক্ত  ও মজবুত হয়েছে l

মানিকগঞ্জের লোকসঙ্গীতের একটি বড় অংশ হচ্ছে গান। বিচার গান। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়  বিচার গান ভিন্ন ভিন্ন নামে ; যশোরে  ধুয়া গান, খুলনায় ‘শব্দ গান’, কুষ্টিয়ায় ‘ভাবগান’ এবং চট্টগ্রামে  কবিগান নামে পরিচিত। বর্তমানে মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিচার গান পরিবেশিত হয়। এখনও বিচার গানে  হাজারো মানুষের ঢল নামে। বিচার গান মূলত অধ্যাত্মসঙ্গীত এবং এ গান বাউলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিচার শব্দের অর্থ বিবেচনা করা, বিশ্লেষণ করা। বিচার গান এমনই এক ধরনের গান- যে গানগুলো বিচার বিশ্লেষণ করেই পরিবেশন করা হয় এবং সুন্দর ভাবে শ্রবন করতে হয়, অনুধাবন করতে হয়। এ বিচার গানের মূলকথা এ গানেই এর প্রশ্ন আবার এ গানেই এর জবাব। কালক্রমে এ ধারার বিস্তার ঘটে এবং অন্যমতের অনুসারী কবি-গায়েনরাও বিচিত্র বিষয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে থাকে। বিচার গানের বিষয় প্রধানত শরিয়ত, মারিফত, নবীতত্ত্ব, আদমতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, নারীতত্ত্ব, যৌবনতত্ত্ব প্রভৃতি। এছাড়া নারী-পুরুষ, গুরু-শিষ্য প্রভৃতি বিষয় নিয়েও এ গানের প্রতিযোগিতা হয়। বিচার গান দীর্ঘসময় ধরে পরিবেশিত হয়। গান পরিবেশনকালে মূল গায়েন দাঁড়িয়ে গান করেন এবং দোহাররা তাঁর সঙ্গে ধুয়া ধরে।

মানিকগঞ্জের লোক সংগীত ভান্ডার সমৃদ্ধ হবার পেছনে মূলত এ অঞ্চলের গায়ক, শিল্পী, বয়াতিদের মরমী সংগীত সাধন ও আধ্যাত্মিক জাগর চৈতন্য কাজ করেছে l বয়াতিরা তাদের ব্যক্তিজীবনে দারিদ্রের মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন এবং অর্থের অভাব তাড়িত হয়ে ছেড়েছেন বই খাতার মমতা। ঘুরে ফিরেছেন সাধক, সন্ন্যাসী, পরম পুরুষের পিছু পিছু। সেখান থেকে অর্জন করেছেন দেহ সাধনের চরমশিক্ষা। যা তাদের সুফি সাধক হতে পরবর্তীতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। এ পোড় খাওয়া হাজারো অভিজ্ঞতার নানা বর্ণনা মেলে বয়াতিদের  গানে। বয়াতিরা কামকে রক্ষা করে পেতে চেয়েছেন প্রেম। যে প্রেম তাদের সন্ধান দিবে পরমপুরুষের। এ প্রেমরূপি মুর্শিদই তো তাদের সন্ধান দিবে পরমপুরূষের জানিয়ে দিবে অন্তর্নিহিত গূঢ়ার্থ। যে মনের মানুষকে পাওয়ার জন্য তাদের মন সর্বদা ব্যথিব্যস্ত। আল্লাহ, ঈশ্বর, গড, পপ, আমরা যা কিছুই বলি না কেন, তিনি তো আসমানে থাকেন না; তিনি তো বিরাজ করেন বান্দার অন্তরে। ভগবান বাস করেন ভক্তের হৃদয়ে। এ বয়াতি গান সাধনার মধ্য দিয়েই তো তালাশ করেছেন জ্ঞানদাতাকে, যে তাকে সম্পূর্ণ এবং একজন পরিপূর্ণ সাধন পুরুষ হিসেবে পরিচিত করে তুলবে। বয়াতি সাধনা করেছেন- সৃষ্টিতত্ত্ব, কারতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, যৌনতত্ত্ব, লোকতত্ত্ব  ইত্যাদি বিষয়াদির উপর যা তাদের সুফিসাধক হিসাবে পরিচিত করে দেয়।

আমাদের মানিকগঞ্জে সুফিসাধক, লোকসঙ্গীতের গায়ক, গীতিকার, সুরকারের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। ভবা পাগলা, কালুশাহ ফকির,  নেধু শাহ্, কায়মুদ্দিন শাহ্, সাইদুর রহমান বয়াতি, গেন্দু বয়াতি ,দারোগালী বয়াতি, আব্দুল হালিম,মমতাজউদ্দিন, রশিদ সরকার প্রমুখ শুধু বয়াতি বা শিল্পী নয় রীতিমত সংগীত ও আধ্যাত্মিক মরমী সাধকশিল্পী l তারা একাধারে গীতিকার সুরকার  শিল্প বটে l এদের সাধনা আর সংগীতে জেলার সীমা ছাড়িয়ে আবহমান বাংলার লোক সংস্কৃতির কিংবদন্তী পুরুষে পরিণত হয়েছেন l পরম্পরায় যারাই এ বয়াতি বা বাউল শিল্পী হয়ে প্রতিষ্ঠিত তারা প্রত্যেকেই গান রচনা করে যাচ্ছেন l মমতাজ বেগম, কিরন চন্দ্র রায়, কদম আলী বয়াতি, আবুল সরকার, তারাবলি বয়াতি, বাবুল সূত্রধর, মুক্তিশাহ ফকির, বাউল হানিফ, বাউল আক্কাস দেওয়ান, সিদ্দিকুর রহমান, হাসিনা সরকার, আলমাস দেওয়ান, বাউল নরেশ প্রমুখ আধ্যাত্মিক মরমী সাধকশিল্পী। প্রাচীন চর্যাগানের সুরারোপ ও শিল্পী হিসেবে মানিকগঞ্জের বাউল শিল্পী অন্তর সরকার খ্যাতি অর্জন করে যাচ্ছেন l

মানিকগঞ্জের হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সব শ্রেনীর মানুষের মাঝেই যাদু-টোনা, ঝার-ফুক, পানি পড়া, তাবিজ-কবজের উপর বিশ্বাস লক্ষ্যনীয়। একজন হিন্দুকেও যেমন অবলীলায় পীর ফকিরের মাজার জিয়ারত ও মানত করতে দেখা যায়, তেমনি একজন মুসলমানকেও দেখা যায় বটের ঝুঁড়িতে সুঁতো বাঁধতে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুবাতাসে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে একে অন্যের উৎসবে স্বতঃফুর্ত অংশ নেয়া, নিমন্ত্রন করার সংস্কৃতি শত বছরের চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজও বদলায়নি।

অন্যদিকে, মানিকগঞ্জের মানুষের মনোজগতে পীর-ফকির, পাগল-দরবেশের কবর-মাজারের প্রতি রয়েছে শ্রদ্ধা এবং গভীর বিশ্বাসের একটি বড় জায়গা। সাটুরিয়ার কালুশাহ ফকিরের মাজার, বাঠইমুড়ির আফাজ পাগলার মাজার, ঝিটকার ‘আল­াবাজানে’র মাজার, পৌর এলাকার মফিজ শাহের মাঝারের মত উলে­খযোগ্য সংখ্যক মাজার, কবরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ এখনও শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। মনোবাসনা পূরণের  আকাঙ্ক্ষায় করেন মানসী (মানত)। আর এসব মাজার কবরকে কেন্দ্র করে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বসে বিভিন্ন দিক মেলা।

মানিকগঞ্জ জেলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান গাজীর গান l গাজীর গান ২ ভাগে বিভক্ত। এ গান উন্নি গানের মত নেচে, গেয়ে গাওয়া হয় এবং অন্যটি পালা। যাকে আমরা গাজীর পালা বলে থাকি। গাজীর গানে কতগুলো পালা আছে। সে সব পালা হলো- কালুগাজীর পালা, মানিকমাঝির পালা, জামাল-কামাল এর পালা, লালচাঁদ বাদশাহ্র পালা, নিজাম বাদশার পালা, মানিক সাধুর পালা, গুলে বাকাওয়ালির পালা, ইয়াকুব নবীর পালা, হেমবেক কেমবেচের পালা, ছয়ফুল মুল্লক বদিউজ্জামানের পালা  ইত্যাদি। যাত্রা ও পালাগানের প্রতি মানিকগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা সহজাত। শত শত বছর ধরে গ্রামীণ জনপদ মাতিয়েছে যাত্রা এবং পালাগান। গনেশ অপেরা, চারণিক, বলাকা অপেরা, বঙ্গ দীপালী অপেরা, রাজলক্ষী অপেরা, নবপ্রভাত অপেরা, সত্য নারায়ন অপেরা, প্রগতি অপেরা, চারিগ্রাম যাত্রাদলসহ দেশখ্যাত অনেক যাত্রাদলের জন্ম মানিকগঞ্জে।

সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের প্রচলিত লোকসঙ্গীতের বাণী-বিষয়বস্তু সামষ্টিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা বহির্ভূত। একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক দ্রুত মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তবে তার বাণী ও বিষয়বস্তু ব্যক্তির ব্যক্তিগত বোধকে আচ্ছন্ন করে জীবন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এ বিচ্ছিন্নতা মানুষের মনোজগৎকে ভাববাদিতা ও আধ্যাত্মিকতার অভিমুখে ঠেলে দেয়। আমাদের মানিকগঞ্জের প্রচলিত লোকসঙ্গীতজুড়ে ভর করে আছে ব্যক্তিগত আনন্দ, বেদনা, হতাশা, দেহকেন্দ্রিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি। মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা। ব্যক্তির সুখ, দুঃখ, বিরহ, হতাশা সামষ্টিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, লড়াই-সংগ্রামের ঠিক বিপরীত। লোকসঙ্গীতের আধ্যাত্মিকতা নিতান্তই বস্তুতান্ত্রিক, যার কিছুটা পরকালের লোভে-মোহে এবং ইহকালের ভীতির মিশ্রণে। স্থবিরতা এবং বৈচিত্র্যহীনতাও প্রচলিত লোকসঙ্গীতের অন্যতম দুর্বলতা । সংস্কৃতির প্রয়োজনটাই গুরুত্বপূর্ণ। উপাদানে নতুন সৃষ্টির পরিচয় অসম্ভব। উপাদানের প্রয়োগ বা ব্যবহারই প্রয়োজনকে অনিবার্য করে। বিষয়বস্তু নির্বাচনে ভাববাদ, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মযোগ, পরকাল, দেহতত্ত্ব, মরমি ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে লোকসঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি বিবেচনা করা হলে সেটা হবে মানিকগঞ্জের প্রচলিত লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা ।

আমাদের মানিকগঞ্জের গ্রামীণ প্রান্তিক জীবনাচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ঋতু ও মৌসুমভিত্তিক নানা উৎসব-পার্বণ পালিত হতো। কালের বিবর্তনে সেগুলো এখন লুপ্তপ্রায়। লোকজ উৎসব-পার্বণের সঙ্গে প্রান্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনের লড়াই, সংগ্রাম, জীবিকাসহ সামগ্রিক জীবনাচার সম্পৃক্ত। অথচ সব উপেক্ষায় বৈচিত্র্য বিনোদনের স্থুলতায় কেবলই উৎসব বিনোদনে লোকসংস্কৃতির প্রতি আমরা আবেগে ঐতিহ্যের করুণা বর্ষণ করি। এ বাস্তবতায় লোকসংস্কৃতিকে কতটুকু মর্যাদা দিচ্ছি? সেটাও কি গুরুত্বপূর্ণ নয়? আসলে আমরা আমাদের সংস্কৃতির সব মাধ্যমকে শুধু বিনোদননির্ভর করে ফেলেছি। বিনোদনের সঙ্গে শিক্ষা, ইতিহাস, দেশপ্রেম, সামষ্টিক চেতনার সম্পৃক্ততা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের অখণ্ড সংস্কৃতিতে দেশের সব মানুষের সংস্কৃতির উপাদান যুক্ত হবে। বাঙালিসহ সব জাতিসত্তার সংস্কৃতিগত ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু থাকবে মূলধারার মর্যাদায়। সংস্কৃতির বৈচিত্র্য থাকবেই। সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। তবে হতে হবে ভাববাদী, ধর্মাশ্রিত, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ আবার  ইহজাগতিক জীবনমুখী বাস্তবতার উপাদানে সমৃদ্ধ।

আমরা আমাদের মানিকগঞ্জের লোকসঙ্গীতকে বাহ্বা দিচ্ছি, পুরস্কৃত করছি। অথচ লোকসঙ্গীতকে আমাদের সংস্কৃতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করে মর্যাদা না দিয়ে সচেতনভাবে ঠেলে দিচ্ছি প্রান্তিকে। সংস্কৃতিগত বিভাজন সৃষ্টির এসব কর্মকাণ্ড প্রতারণা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। লোকসংস্কৃতিকে করুণা বর্ষণের এসব মহৎ(!) উদ্যোগের নেপথ্যে নানা উদ্দেশ্য নিহিত। ভাববাদী-আধ্যাত্মিকতার ধূম্রজালে আটকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-বঞ্চনায় নিশ্চুপ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণকে বিনা বাক্যে মেনে নেব সেটি আশা করা যায় না। আবার  পারলৌকিক লোভ এবং ইহকালের ভয়-ভীতিতে ডুবে থাকবতাও কামনা হতে পারে না। লোকসংস্কৃতির নবজাগরণে সংস্কৃতি নিয়ে স্বপ্নে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘এক বিশাল পুনরুত্থানের ছবি’ দেখেন, ‘যে, পুনরুত্থান মানুষকে তার শেকড়ে এবং মাটিতে নিয়ে যাচ্ছে; সমষ্টির জীবনের ও ভালোবাসার কাছে, তার সামান্য চাওয়া-পাওয়া, তার সম্মান এবং বিশ্বাসের জায়গাটায় নিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমাধ্যম আমাদের উৎপাদন নয়, তবে আমরা একে ব্যবহার করব, প্রয়োজন হলে আত্মস্থ করব। কিন্তু তা পশ্চিমের আরোপিত সূত্র মেনে নয়, বরং আমাদের চিরকালীন সৌন্দর্য, মূল্যবোধ ও ভালোবাসার সূত্র মেনে’। সাবধান থাকতে হবে, সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের অনগ্রসর মানুষদের সন্তুষ্ট এবং অবদমিত রাখার অভিপ্রায়ে লোকসংস্কৃতি চর্চার বৃত্তে আটকানোর গভীর চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে বিভাজনের বীজ রোপণ করে আমাদের সমষ্টিগত মানুষের ঐক্য-সংহতি বিনাশে নানামুখী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। দেশের সব মানুষের অভিন্ন-অখণ্ড সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠকদের প্রধান কর্তব্য বলেই বিবেচনা করি। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠনকে অগ্রসর হতে হবে।

আমাদের স্বপ্নের স্বদেশে লোকসংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটলে ঘরে ঘরে লোক পুরাণের চর্চা হবে। লোকসংস্কৃতির নবজাগরণের কালে সেই চারণরা রিভু সম্মানে পূজিত হবেন। দেশের ধনীদের তালিকায় লোকসংস্কৃতির চারণ শিল্পীদের নাম যুক্ত হবে। কারণ আমাদের চারণরা রচনা করেন আমাদের লোকসংস্কৃতির সোপান। লোকসংস্কৃতির সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং চর্চা অব্যাহত থাকতে হবে। তাহলে স্বপ্নের স্বদেশে সেই সাথে মানিকগঞ্জের লোকসংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটাতে আশা করা যায়।

দেশকালের বাস্তবতায় সেই হাজার বছর আগেই এই বাংলায় এক উন্নত শিল্পরুচি তৈরি হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই রুচিবোধ আজো প্রবহমান। সেই সমৃদ্ধ রুচি নির্মাণে আমাদের পুতুল নাচ, লীলা, শাস্ত্রগান, কবিগান, ভাসান, গাজীরগান, পালা, কথকতা, লক্ষ্মীর গান, যুগীপর্বের গান, বিচারগান, ঝুমুর, গীতিকা, যাত্রা, অষ্টক, ঘেটু, জারি, সারি, নাটগীত, পাঁচালী, লেটু, ভাটিয়ালি, মুর্সিদী, গাজীরগান ইত্যাদি লোকসংস্কৃতির বিচিত্র অনুষঙ্গের অপরিসীম ভ‚মিকা রয়েছে। লোকপরম্পরায় এর চর্চার পাশাপাশি গাজন, রথযাত্রা, নবান্ন, মেলা, তাজিয়া ইত্যাদি উৎসব-পালা, পার্বণের আয়োজন সমৃদ্ধ করেছে। এমনিতেই আমাদের বারো মাসে তের পার্বণ। আর এই পার্বণকে ঘিরেই নানা লোকাচারে পূর্ণ আমাদের লোকায়ত জীবন। স্বপ্নের স্বদেশে লোকসংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটলে তবেই মানিকগঞ্জের লোকসংস্কৃতি এবং অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্ম চেতনায় সমৃদ্ধ লোক সংগীত টিকে থাকবে যুগ যুগ ধরে l ইতিহাস ঐতিহ্যের গৌরবগাঁথা ও পূর্বসুরীদের অনির্বাণ আদর্শে পথ চলছে আমাদের মানিকগঞ্জ ; এ চলার পথেই একদিন গড়ে উঠবে স্বপ্নের মানিকগঞ্জ- যে স্বপ্ন দেখে অতীত হয়েছেন আমাদের পূর্ব পুরুষেরা। (সংগৃহিত)

মৃদুল রহমান- কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ৷