শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

নজরুল-প্রমীলার স্মৃতি বিজরিত-‘তেওতা জমিদার বাড়ি’

মানিকগঞ্জের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে তেওতা জমিদার বাড়ি ঐতিহ্য ও দৃষ্টি নান্দনিকতার দিক দিয়ে অনন্য। এর অবস্থান মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের তেওতা গ্রামে।

জানা যায়, পঞ্চানন সেন নামে এক ব্যক্তি ৭.৩৮ একর জমি নিয়ে ১৭ শো শতকে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। এই প্রাসাদের পূর্বদিকে রয়েছে লালদিঘী অন্দরমহল। এই প্রাসাদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে টালির তৈরি বিশাল আকৃতির কাচারিঘর। পাশে আছে ৭৫ ফুট উচ্চতার নবরত্ন মঠ। নবরত্ন মঠের পশ্চিম দিকে রয়েছে শান বাঁধানো পুকুরঘাট। জমিদারদের উপাসনালয় হিসেবে লালদীঘি ময়দানের মাঝে রয়েছে একটি নাট মন্দির। ছোট বড় মিলিয়ে প্রাসাদটিতে মোট ৫৫টি কক্ষ শোভা পাচ্ছে। পঞ্চানন সেন প্রাসাদটি নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে হেমশংকর ও জয়শংকর নামে দুই ব্যক্তি এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ভারত বিভক্তির পর তারা দেশ ত্যাগ করলে প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর প্রাসাদটির দেখাশোনা ও দায়দায়িত্ব বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় চলে যায়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পত্নী প্রমীলার পৈতৃক ভিটা এই প্রাসাদ সংলগ্ন হওয়ায় এই জমিদার বাড়ি ঘিরে কবি এবং কবি পত্নীর বহু স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে ৷


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর গড়ে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার দর্শনার্থী এই জমিদার বাড়ি ভ্রমন করতে আসেন। কথিত আছে, বিদ্রোহী কবি তার সাহিত্য ভান্ডার পরিপূর্ণ করতে এবং প্রচারের স্বার্থে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ির ব্যারিস্টার কিরণ শঙ্কর রায়ের বাড়িতে একাধিকবার যাতায়াত করেছেন। নজরুলের সাহিত্য চর্চার প্রেরণা এবং প্রেমের উৎস কবির সহধর্মিণী আশালতা সেনগুপ্ত দোলন বা দুলি ছিলেন তেওতা গ্রামের বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত এবং তার স্ত্রী গিরিবালা দেবীর একমাত্র সন্তান। আশালতা সেনগুপ্ত ১৯০৮ সালে তেওতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তার বাবা বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরায় নায়েব পদে চাকরি করতেন। কাকা ইন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরায় কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর ছিলেন।

ইন্দ্র কুমার চাকরি সূত্রে কুমিল্লার কান্দির পাড়ে বাড়ি-ঘর করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস শুরু করেন। তবে বসন্ত কুমারের পরিবার তেওতার বাড়িতে বসবাস করতেন। হঠাৎ বসন্ত কুমারের মৃত্যুতে আশালতার মা অসহায় হয়ে পড়লে তার কাকা ইন্দ্রকুমার আশালতা ও তার মা গিরিবালা দেবীকে কুমিল্লার কান্দির পাড়ে নিয়ে যান। কাজী নজরুল ইসলাম তার বন্ধু আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লায় বেড়াতে আসলে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে তার সঙ্গে আশালতার পরিচয় হয়। নজরুল আশালতার টানে পাঁচবার কুমিল্লায় আসেন এবং বিয়ের আগে তেওতায় আসেন তিনবার। শেষবার জেল থেকে মুক্ত হয়ে কুমিল্লায় আসলে আশালতা ও নজরুলের প্রেমের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এক পর্যায়ে নজরুল কুমিল্লা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান।

সামাজিক চাপে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আশালতার মা গিরিবালা দেবী আশালতাকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। ১৯২৪ সালে গিরিবালা দেবীর ইচ্ছায় নজরুল ও আশালতার বিয়ে সম্পন্ন হয়। সবকিছু মিলিয়ে তেওতা জমিদার বাড়িটি ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করে কালের সাক্ষী হয়ে অযত্ন অবহেলায় ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। জমিদার বাড়ির পূর্বপাশে দৃষ্টিনন্দন ইউনিয়ন ভূমি অফিস, পূর্ব দক্ষিণে তেওতা একাডেমি, পশ্চিম দক্ষিণে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কৃষি পরামর্শ অফিস, ব্যাংক এশিয়াসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জমিদার বাড়ির সামান্য পশ্চিমে রয়েছে তেওতা বাজার সংলগ্ন নয়নাভিরাম যমুনা নদী।

জমিদার বাড়ির সামনের বিশাল নবরত্ন মন্দিরটি নতুন করে রঙ করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের অনেক পর্যটক এই জমিদার বাড়িটি দেখতে আসেন। তবে থাকার জন্য তেমন ভালো কোন ব্যবস্থা নেই বলে জানালেন অনন্ত।

পলিমাটি

তেওতা জমিদার বাড়িটি মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীন একটি জমিদার বাড়ি ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এটি উপজেলার তেওতা নামক গ্রামে অবস্থিত। বর্তমানে এই স্থাপনাটির মালিক বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

বিভিন্ন ইতিহাস থেকে জানতে পারি, ১৭শ শতকে জমিদার পঞ্চানন সেন এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। যদিও পঞ্চানন সেন এক সময় খুব দরিদ্র ছিলেন তবে  দিনাজপুর অঞ্চলে তামাক উৎপাদন করে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হওয়ার পর তিনি এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। তবে পঞ্চানন সেনের পর এখানে  জয়শংকর ও হেমশংকর তাদের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দেশ ভাগের পর তারা দুজনেই ভারত চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

পলিমাটি

এই জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবীর বাড়ি। তাই জমিদার বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবি নজরুল ও আশালতা সেনগুপ্ত প্রমীলা (দুলি) দেবীর প্রেমের স্মৃতি। প্রমীলার রুপে মুগ্ধ হয়ে নজরুল লিখেছিলে, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ’।

প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের ভাতিজা বীরেন সেনের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় সূত্রে প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল। এভাবেই প্রমীলা দেবীর সঙ্গে নজরুলের প্রেম। নজরুল অনেকবারই তেওতা এসেছেন; থেকেছেন। লিখেছেন ছোট হিটলার, হারাছেলের চিঠি, ইছামতি, লিচুচোরসহ অনেক কবিতা, গান ও কীর্তন। ছোট হিটলার কবিতায় কবি বলছেন, ”ভয় করি না পোলিশদের জার্মানির ঐ ভাওতাকে/ কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামার বাড়ি তেওতাকে…।”

পলিমাটি

‘কুহেলিকা’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট এখানে বসেই  রচনা করেছেন নজরুল। জমিদার বাড়ির কাছে যমুনা নদীর সৌন্দর্য দেখে কবি লিখেছিলেন ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী…’।

পলিমাটি

পর্যটকদের থাকা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং জমিদার বাড়ির অন্দর মহলকে সুসজ্জিত করে পুরাকীর্তির এই স্থানটিকে আকর্ষণীয় করে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকার এ দিকটায় আরো মনযোগী হলে ঢাকার অদূরের এই তেওতা জমিদার বাড়িটি হতে পারে পর্যটকদের জন্য এক দারুণ আকর্ষণীয় স্থান।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা