ষড়ঋতুর লীলাভূমি, সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বিধৌত বিশ্বের বৃহত্তম এই ব-দ্বীপে একের পর এক আসে ঋতুর কাফেলা আর বৈচিত্রের দোলা দিয়ে যায় লক্ষ কোটি বাঙালি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়। বর্ষার ক্লান্তিকর দিনের অবসানে শোনা যায় শরতের পদধ্বনি রাতের শিশির সিক্ত দুর্বাদলের কমনিয়তায় আর শিউলীর মাতাল গন্ধে বাঙালির হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায় শারদীয়ার স্নিগ্ধতা আর দুর্গার আগমনের সুরেলা বাতাস। শরতের আকাশে একদিকে চলে সাদা মেঘের ভেলার উদাসী আনাগোনা অন্যদিকে কোন সুদূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দে আবালবৃদ্ধবনিতার অন্তরে জাগে শিহরণ।
কথিত আছে রামচন্দ্র অসুরবধ ও সীতা উদ্ধারের নিমিত্তে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। যাহা অকাল বোধন হিসেবে পরিচিত। রামচন্দ্রের আরাধনায় দেবী তুষ্ট হন এবং শতপুত্রসহ রাবণ নিহত হন। সেই থেকে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে শরৎকালে অর্থাৎ আশ্বিনের শুক্লা তিথীতে দেবী দুর্গার পূজার প্রচলন শুরু হয় ।
ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, তৎকালীন শ্রীহট্ট (বর্তমানে বাংলাদশের সিলেট) এর রাজা গনেশ পঞ্চদশ শতকে, ষোড়শ শতকে রাজশাহী অঞ্চলের রাজা কংশ নারায়ণ দুর্গাপূজা করেন। অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্ৰ দুর্গাপূজা করেন।
দুর্গোৎসব দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হওয়া বাঙালি হিন্দু সমাজের বৃহত্তম ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। শাস্ত্রীয় বিধানে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে এবং চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে দুর্গোৎসব পালন করা যায়। চৈত্রে অর্থাৎ বসন্তকালের দুর্গাপূজা বাসন্তি দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা অধিক জনপ্রিয়।
দুর্গাপূজা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্গত একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকলেও এটি বিশেষকরে বাঙালিদের উৎসব হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় এই উৎসব অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করে থাকেন। এখন আসাম ও উড়িষ্যাতেও দুর্গাপূজা মহাসমারোহে পালিত হয়ে থাকে। বর্তমান কালে পাশ্চাত্য, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যে সকল দেশে বাঙালিরা বসবাস করে সেখানেও মহাসমারোহে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে থাকে। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে “ভয়েসেস অব বেঙ্গল সিজন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসাবে বিরাট দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বাঙালি অভিবাসীবৃন্দ ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আজকাল দুর্গাপূজা দুইভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত ভাবে পারিবারিক স্তরে ও সমষ্টিগতভাবে পাড়া স্তরে। ব্যক্তিগত পূজা গুলো নিয়মনিষ্ঠা ও শাস্ত্রীয় বিধান পালনে বেশি আগ্রহী হয়, এগুলোর আয়োজন মূলত বিত্তশালী পরিবারগুলোতেই হয়ে থাকে। অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে যৌথ উদ্যোগেও দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। এগুলি বারোয়ারী বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। সর্বজনীন পূজা উদ্ভবের ইতিহাসের সংগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বর্তমান সময়ে এই পূজাগুলোতে থিম (Theme) পূজা অর্থাৎ থিম ভিত্তিক মন্ডপ ও প্রতিমা নির্মানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এবাবের দুর্গাপূজাও আবহমান কালের শান্তি ও সমৃদ্ধির বাণী নিয়ে বাঙালির দরজায় কড়া নাড়ছে। এই পূজার মাধ্যমে পৃথিবীর নানা ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণীবদ্ধ মানুষের মধ্যে আসুক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভালবাসা ও মঙ্গলের আবাহন।
(চিন্ময়ী ১৯ তম সংকলন ২০১১ থেকে সংগৃহিত)


