বাংলা সাহিত্যের আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র আছেন, যাঁদের দীপ্তি সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের সৃষ্টি কখনো পুরোনো হয় না, বরং প্রতিটি পাঠে নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। সুকুমার রায় তেমনই এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তিনি কেবল শিশু-কিশোর সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় লেখক নন, বাংলা ভাষার কল্পনা, কৌতুক, ব্যঙ্গ ও শব্দশিল্পের এক অনন্য স্থপতি।
৩০ অক্টোবর ছিল তাঁর জন্মদিন। ১৮৮৭ সালের এই দিনে কলকাতার এক সাহিত্য-সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য স্রষ্টা। তাঁর কলমে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার এমন এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটেছে, যেখানে অসম্ভবও হয়ে ওঠে স্বাভাবিক, অযৌক্তিকও প্রকাশ করে গভীরতর সত্য। জন্মদিনে এই শব্দজাদুকরের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা কেবল স্মরণে নয়, তাঁর সৃষ্টিকে নতুন করে পাঠ করার মধ্যেও।
আজগুবি কল্পনার ভেতরেও যে সত্যের বসবাস
সুকুমার রায়ের সাহিত্যজগৎ এক আশ্চর্য কল্পলোক। সেখানে গোঁফওয়ালা ছাগল, বুড়োর দল, হাঁসজারু, কুমড়োপটাশ কিংবা হুঁকোমুখো হ্যাংলারা শুধু বিচিত্র চরিত্র নয়, তারা আমাদের চেনা সমাজ ও মানুষের নানা অসংগতির প্রতিচ্ছবি। তাঁর আবোল তাবোল বাংলা সাহিত্যে এমন এক স্বতন্ত্র শিল্পভুবন নির্মাণ করেছে, যার তুলনা বিরল।
প্রচলিত অর্থে শিশুদের আনন্দ দেওয়াই তাঁর সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। হাসির আড়ালে তিনি তুলে ধরেছেন সমাজের অসারতা, মানুষের আত্মম্ভরিতা, অন্ধ অনুকরণ, ক্ষমতার দম্ভ এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়মের অযৌক্তিকতা। তাঁর রচনায় যে হাস্যরসের প্রবাহ, তার গভীরে রয়েছে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও সূক্ষ্ম জীবনবোধ। ফলে শিশুরা তাঁর লেখা পড়ে আনন্দ পায়, আর বড়রা আবিষ্কার করেন নিজেদের সমাজ ও সময়ের নানা অসংগতি।
‘হযবরল’ তাঁর কল্পনাশক্তির আরেক অনন্য নিদর্শন। যুক্তি ও বাস্তবতার প্রচলিত কাঠামোকে ভেঙে তিনি সেখানে নির্মাণ করেছেন এক উলটপালট জগৎ। কিন্তু সেই উলটপালটের মধ্য দিয়েই যেন আমাদের চেনা পৃথিবীর অদ্ভুত নিয়মকানুনগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পাগলা দাশু চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, প্রচলিত বুদ্ধির বাইরে দাঁড়িয়েও কীভাবে একজন মানুষ তার স্বতন্ত্র চিন্তা ও কল্পনার জগৎ তৈরি করতে পারে।
বহুমাত্রিক প্রতিভার এক উজ্জ্বল অধ্যায়
সুকুমার রায় শুধু কবি কিংবা কথাসাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন দক্ষ চিত্রকর, আলোকচিত্রী, মুদ্রণপ্রযুক্তিবিদ ও সম্পাদক। প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মুদ্রণপ্রযুক্তি ও আলোকচিত্র বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান। দেশে ফিরে পিতার প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণ ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত হন। পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত শিশু-কিশোর পত্রিকা সন্দেশ-এর সম্পাদনার দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
তাঁর এই বহুমাত্রিক সৃজনশীলতা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। শব্দের পাশাপাশি রেখাচিত্রেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। নিজের লেখার সঙ্গে নিজের আঁকা ছবি যুক্ত করে তিনি পাঠকের সামনে এমন এক সমন্বিত শিল্পরূপ হাজির করেছিলেন, যা বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে।
মাত্র ৩৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে সৃষ্টিসম্ভার রেখে গেছেন, তা আজও বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি অতিক্রম করেছেন মৃত্যুর সীমারেখা।
সময় পেরিয়েও কেন প্রাসঙ্গিক সুকুমার রায়?
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে সুকুমার রায়ের সাহিত্য নতুন করে পাঠ করা প্রয়োজন। কারণ তাঁর রচনা আমাদের শেখায়, কল্পনা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি। প্রশ্ন করতে শেখা, প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করা, অযৌক্তিকতাকে চিনতে পারা এবং হাসির মধ্য দিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করা, এসবই তাঁর সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
শিশুমনের স্বাভাবিক কৌতূহল ও স্বাধীন চিন্তার জগৎকে তিনি কখনো সংকুচিত করেননি। বরং সেই কৌতূহলকে দিয়েছেন ডানা। তাঁর লেখায় শিশুরা শুধু গল্পের পাঠক নয়, তারা কল্পনার এক স্বাধীন পৃথিবীর নাগরিক।
বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার, ছন্দ, অন্ত্যমিল ও ধ্বনির বৈচিত্র্য নিয়ে তাঁর নিরীক্ষা আজও লেখক ও পাঠকদের বিস্মিত করে। অর্থহীন শব্দের মধ্যেও কীভাবে অর্থের ইঙ্গিত তৈরি করা যায়, কীভাবে শব্দের খেলা দিয়ে একটি সম্পূর্ণ দৃশ্যকল্প নির্মাণ করা যায়, সুকুমার রায় তার অসামান্য উদাহরণ।
সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি এখানেই। একটি ভালো সৃষ্টি কেবল তার সময়কে ধারণ করে না, ভবিষ্যতের পাঠকের মনেও নতুন করে ভাবনার জন্ম দেয়।
শ্রদ্ধা ও উত্তরাধিকার
সুকুমার রায় আমাদের শিখিয়েছেন, গম্ভীর বিষয়কে সব সময় গম্ভীর ভাষায় প্রকাশ করতে হয় না। কখনো একটি হাসি, একটি অদ্ভুত শব্দ কিংবা একটি অসম্ভব কল্পনাও মানুষের চিন্তার গভীরে পৌঁছে যেতে পারে। তাঁর সাহিত্য আমাদের শৈশবকে আনন্দময় করেছে, কৈশোরকে কৌতূহলী করেছে এবং পরিণত বয়সেও নতুন করে হাসতে ও ভাবতে শিখিয়েছে।
তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং বাংলা ভাষার সৃজনশীল স্বাধীনতা, কল্পনার ঐশ্বর্য এবং নির্মল হাস্যরসের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো।
যত দিন বাংলা ভাষা থাকবে, যত দিন বাঙালি শিশু-কিশোরেরা নতুন কিছু কল্পনা করতে চাইবে, যত দিন মানুষ নিজের চারপাশের অসংগতিকে দেখে একটু নির্মল হাসতে পারবে, তত দিন সুকুমার রায় প্রাসঙ্গিক থাকবেন।
তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর কল্পনার রাজ্যে আজও ছুটি নেই। সেখানে প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয় আবোল তাবোল, নতুন করে জেগে ওঠে হাসির এক স্বাধীন পৃথিবী।
বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য শব্দশিল্পীর জন্মদিনে পলিমাটি জানায় গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।
© পংকজ পাল


