মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬

সাহেলা সার্মিনের গল্প || প্রতিহিংসা

 প্রতিহিংসা

পৃথিবীর আলো বাতাসে যেমন সবার অধিকার আছে তেমনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। আছে স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার, কাওকে ভাবার অধিকার। কারো সাথে সম্পর্ক গড়ার কিংবা ভাঙার অধিকার। সেটা একান্তই ব্যক্তিগত। তাই বলে কাওকে মিথ্যে দোষারোপ করা, কারো কাজে অযথা হস্তক্ষেপ করা, মনঃকষ্টের শিকার হওয়া মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

লিরা ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে শিল্প কলা অনুষদে শেষ বর্ষের ছাত্রী। সেই যেদিন এইচ এস সি প্রথম পাস করে সেদিন থেকেই লাইসের সংগে লিরার পরিচয়। তারপর দুজনে একই অনুষদে ভর্তি। একসাথে ক্লাস, সেমিনার, টিউটোরিয়াল, ফাংশনে এটেন্ট করা, একসাথে বসে লাইব্রেরি ওয়ার্ক, পরীক্ষা, সব সব। ওদের আন্তরিকতা এবং একসাথে চলাকে অনেকেই হিংসা করতো।

একসাথে চলাফেরা করলেও “ভালোবাসি” বলেনি কেউ কাওকে কখনো। স্রেফ বন্ধুত্ব। তবে দু’জনেই খুব ভালো স্টুডেন্ট, কিন্তু কেউ কাওকে ডিঙিয়ে যাওয়ার প্রবণতা নেই বরং একজন আরেক জনকে জিতিয়ে দেওয়ার মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন পরীক্ষার তেমন বাৎসরিক কম্পিটিশনে। এভাবেই বেশ চলছিলো। হঠাৎ দু’জনের মাঝে বিধি বাম হয়ে এলো সানজিদা। ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্টুডেন্ট। দেখতে সুন্দরী ;একটু ক্রিটিক্যাল এবং হিংসুটে। সানজিদা লাইসের সাথে ঘনঘন মিশতে থাকে এবং লিরা সম্পর্কে নেগেটিভ মন্তব্য লাইসের সামনে উপস্থাপন করে। একসাথে ফুসকা খায়, বাদাম ও আইচক্রিম খেতে খেতে ঘুরে বেড়ায়।

ফাইনাল ইয়ার, সামনে পরীক্ষা। পড়ার ব্যস্ততায় সময়ের ভারি বোঝা, তার মাঝে সানজিদার কিছু বাঁকা কথা দ্বগ্ধ করে লিরাকে। লিরা সব সহ্য করতে পারে কিন্তু মিথ্যা মোটেও সহ্য করতে পারেনা।

লিরা বিনয়ী, পরোপকারী, ভদ্র একটি মেয়ে। অথচ সানজিদা ওকে মিথ্যাবাদী, একরোখা, একগুয়ে ইত্যাদি আখ্যা লেপন করে ওর সুন্দর, সুশ্রী, সুকোমল হৃদয়ে কষ্টের দাহনে অনন্ত কুপে নিক্ষেপ করেছে! এখন লাইসও তাই বলে, তাই ভাবে। এখন টি এস সি চত্বরে লাইসের করস্পর্শ হয় সানজিদার করে। লাইসের দু’চোখে মুক্ত ঝরে সানজিদার হাসিতে। বন্ধুদের মাঝে কানাকানি। কেউ লিরার পক্ষে কেউবা লাইসের পক্ষে কুট কৌশলে বাহাবা ছেড়ে বাদাম, ফুসকা বা চটপটির ভাগিদার হয়। কিন্তু লিরা পক্ষে বা বিপক্ষে কারো কথাতেই তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে কষ্ট উপলদ্ধি করে, নিরবে অশ্রু ঝরায়। তারপর কষ্টটাকে খেয়ে ফেলে। লেখাপড়ার মনোযোগ বাড়াতে চেষ্টা করে। তাকে যে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। একটা সম্পর্কের ভাঙ্গনে তাকে ভেঙে পড়লে চলবে না।

এভাবেই চলে গেলো কয়েকটি মাস। যথারীতি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলো। দু’জনের প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে। কথা বলার জন্য মনের ভিতর ষাট ডিগ্রী উত্তাপে টগবগ করতে থাকে। লিরাও লক্ষ্য করে লাইস তার সাথে কথা বলার জন্য উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। লিরা মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ঝড়ে যখন ডালপালা ভেঙে যায় তখন ভাঙা ডালগুলো কেটে ফেলাই শ্রেয়। পুরোনো ভাঙা ডালপালা গাছের সৌন্দর্য নষ্ট করে বার্ধক্য এনে দেয় । তাই সেগুলোর জন্য মায়া করে কোনো লাভ নেই। ভাঙা ডালপালা কেটে ফেললে আবার নতুন ডালে সুশোভিত সবুজে পরিপূর্ণ হবে, লিরা সেটা ভালো করেই বুঝেছিলো।

লেখক পরিচিতি

সাহেলা সার্মিন
সাহেলা সার্মিন
সাহেলা সার্মিন ( শিরিন), মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার কেল্লাই গ্রামে জন্ম। পিতা- মোহাম্মদ আব্দুল হাই, পেশায় শিক্ষক ছিলেন। মাতা- জোহুরা বেগম, গৃহিণী। ১৯৯২ সালে এস এস সি, ১৯৯৪ সালে এইচ এস সি, ১৯৯৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স এবং ১৯৯৮ সালে মাস্টার্স ডিগ্রী । স্বামী শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত। নিজে সহকারী অধ্যাপক। এক ছেলে এবং এক মেয়ের জননী।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা