শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬

পংকজ পালের গল্প

জলের নিচে শেষ বিকেল

বাড়িটা দূর থেকে দেখলে মনে হতো, অন্ধকারের মধ্যে কেউ একটা মৃত সময়কে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
শেওলা ধরা দেওয়াল, ভাঙা কার্নিশ, লোহার গেটের গায়ে বুনো লতাপাতা। একসময় এই বাড়ির উঠোনে বিকেল নামত মানুষের কোলাহলে। সন্ধ্যায় তুলসীমঞ্চে প্রদীপ জ্বলত। দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় বসে হারমোনিয়াম বাজাতেন বাড়ির ছোট বউ মৃণালিনী। এখন সেখানে বাদুড়ের বাসা, মাকড়সার জাল আর বাতাসের দীর্ঘশ্বাস।
বাড়িটার নাম শঙ্খনীড়।
পনেরো বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর অর্ক আর কখনো সেখানে ফেরেনি। মায়ের মৃত্যুর পর তো নয়ই।
অথচ গত বৃহস্পতিবার ডাকপিয়ন তার শহরের ফ্ল্যাটে একটি চিঠি দিয়ে গেছে।
হলুদ হয়ে যাওয়া খাম। ওপরে বাবার হাতের লেখা।
ভেতরে মাত্র কয়েকটি বাক্য।
‘অর্ক,
অনেক দিন হয়ে গেল। এবার বাড়ি আয়। তোর মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার কাছে বসে থাকে। কাউকে কিছু বলতে পারি না।
আর একটা কথা, দক্ষিণের ঘরটা খুলিস না।
— বাবা’
চিঠির তারিখ দেখে অর্কর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল।
পনেরো বছর আগের তারিখ।
বাবার মৃত্যুর ঠিক তিন দিন আগে।
সেদিন রাতেই অর্ক রওনা হয়েছিল।
গ্রামের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে রাত প্রায় এগারোটা। আকাশে আধখানা চাঁদ। চারদিকে কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। রাস্তার পাশে বাঁশবাগান থেকে মাঝে মাঝে শুকনো পাতার শব্দ আসছে।
শঙ্খনীড়ের সামনে গিয়ে অর্ক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার তার চোখে পড়ল।
বাড়ির দোতলার দক্ষিণের জানালায় আলো জ্বলছে।
অথচ বাড়িটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই বহু বছর।
গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, উঠোনে কেউ যেন একটু আগেই হেঁটে গেছে। ভেজা মাটির ওপর ছোট ছোট পায়ের ছাপ। ছাপগুলো সোজা বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে।
দরজা খোলা।
ভেতরে ঢুকে অর্ক অবাক হয়ে গেল। বসার ঘরের টেবিলে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। পাশে কাচের গ্লাসে জল। আর একটা থালায় ভাত, ডাল ও আলুভাজা।
খাবারগুলো থেকে তখনো হালকা ধোঁয়া উঠছে।
অর্কর মনে পড়ল, ছোটবেলায় মা ঠিক এভাবেই রাতের খাবার সাজিয়ে রাখতেন। সে দেরি করে বাড়ি ফিরলে মা কখনো খাবার সরিয়ে রাখতেন না।
হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা গলা ভেসে এল।
— অর্ক, এসেছিস বাবা?
অর্কর সমস্ত শরীর শীতল হয়ে গেল।
এ গলা তার মায়ের।
যে মা বারো বছর আগে মারা গেছেন।
— মা?
কোনো উত্তর এল না।
অর্ক সিঁড়ির দিকে এগোল। ঠিক তখনই পকেটের ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে একজন বৃদ্ধের কণ্ঠ শোনা গেল।
— তুমি কি অর্ক বলছ?
— জি। কে বলছেন?
— আমি হরিপদ। তোমাদের বাড়ির পাশেই থাকি। তুমি কি এখন শঙ্খনীড়ে?
অর্ক বিস্মিত হলো।
— হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— বাবা, একটা কথা শোনো। তুমি বাড়ির ভেতরে থাকলে এখনই বেরিয়ে এসো।
— কেন?
— কারণ, ওই বাড়িতে আজ রাতে কেউ থাকার কথা নয়।
— আমি তো আছি।
— তুমি একা?
অর্ক উত্তর দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় দোতলা থেকে মায়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
— অর্ক! তোর বাবা এসেছে। নিচে আয়।
ফোনের ওপাশে বৃদ্ধের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— তুমি কি কিছু শুনতে পাচ্ছ?
অর্ক ধীরে বলল,
— মা ডাকছেন।
বৃদ্ধ এবার প্রায় ফিসফিস করে বললেন,
— তোমার মা যখন বেঁচে ছিলেন, তখনও তিনি ওই দক্ষিণের ঘর থেকে কাউকে ডাকতেন।
— কাকে?
— তোমার দাদাকে।
অর্ক থমকে গেল।
তার কোনো দাদা নেই।
অন্তত তার জানামতে নেই।
অর্ক ফোন কেটে দিল।
দোতলায় উঠতেই পুরোনো কাঠের মেঝে কেঁপে উঠল। করিডরের শেষ মাথায় একটা দরজা আধখোলা। সেখান থেকেই আলো আসছে।
দক্ষিণের ঘর।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অর্কর মনে হলো, ঘরের ভেতরে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে ধীরে দরজাটা ঠেলে দিল।
ঘরের মধ্যে একটা বড় কাঠের আলমারি, পুরোনো খাট, দেওয়ালে কয়েকটি বিবর্ণ ছবি। জানালার পাশে একটা দোলনা। দোলনাটা খুব আস্তে আস্তে দুলছে।
অর্কর মনে পড়ল, এই ঘরে তাকে কখনো ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
ছোটবেলায় একবার কৌতূহলবশত দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। মা ছুটে এসে তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন মায়ের মুখে এমন আতঙ্ক দেখেছিল, যা পরে আর কখনো দেখেনি।
টেবিলের ওপর একটা ফটো অ্যালবাম পড়ে ছিল।
অর্ক পাতা উল্টাতে লাগল।
একটি ছবিতে তার বাবা-মা দাঁড়িয়ে আছেন। মায়ের কোলে একটি ছোট ছেলে। বয়স চার কি পাঁচ।
ছবির পেছনে লেখা—
‘আমাদের অয়ন। পাঁচ বছরের জন্মদিন।’
অর্কর বুকের মধ্যে কেমন একটা মোচড় দিল।
অয়ন!
নামটা তার অচেনা নয়। বহু বছর আগে কোনো এক রাতে ঘুমের মধ্যে সে এই নাম শুনেছিল। মা কাঁদছিলেন। বাবা বলেছিলেন, ‘পুরোনো কথা ভুলে যাও, মৃণালিনী।’
অর্ক আরেকটি ছবি হাতে নিল।
ছবিতে সেই একই শিশু। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট অর্ক।
দুজনের মুখের অদ্ভুত মিল।
ছবির পেছনে লেখা—
‘দুই ভাই। অয়ন ও অর্ক।’
অর্কর হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
তার জন্মের আগেই কি তার কোনো ভাই ছিল?
হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা পুরোনো টেলিফোনটা বেজে উঠল।
ক্রিং… ক্রিং…
পনেরো বছর ধরে বন্ধ থাকা টেলিফোন!
অর্ক ধীরে রিসিভার তুলল।
— হ্যালো?
ওপাশে শিশুর গলা।
— অর্ক?
— কে?
— আমাকে চিনতে পারছিস না?
— তুমি কে?
শিশুটি একটু হেসে বলল,
— আমি অয়ন। তোর দাদা।
অর্কর গলা শুকিয়ে এল।
— তুমি কোথায়?
— এই তো। তোর পাশেই।
অর্ক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
আবার ফোনের ওপাশ থেকে কণ্ঠ এল।
— মা তোকে অনেক দিন ধরে খুঁজছে। তুই একবার মায়ের কাছে আয় না!
— মা কোথায়?
— আয়নায় তাকিয়ে দেখ।
ফোনটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
অর্ক ধীরে ধীরে ঘরের বড় আয়নাটার দিকে এগোল।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখার কথা।
কিন্তু সেখানে সে একা নয়।
তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট ছেলে। লাল রঙের জামা, কপালের ওপর পড়ে থাকা চুল। মুখে অদ্ভুত এক মায়াবী হাসি।
ছেলেটি আয়নার ভেতর থেকে বলল,
— এত দেরি করলি কেন, ভাই?
অর্ক চোখ বন্ধ করে ফেলল।
ঠিক তখনই ঘরের দরজায় বাবার কণ্ঠ শোনা গেল।
— অর্ক! আয়না থেকে সরে আয়!
বাবাকে দেখে অর্কর আর কোনো সন্দেহ রইল না।
সেই একই মুখ। সেই সাদা পাঞ্জাবি। কপালের পরিচিত ভাঁজ।
— বাবা!
বাবা দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরলেন।
— তুই এখানে এলি কেন? কতবার বলেছি, এই ঘরে আসবি না!
— বাবা, অয়ন কে?
বাবার মুখের রং বদলে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন,
— তোর দাদা।
— তোমরা আমাকে কখনো বলোনি কেন?
বাবা জানালার দিকে তাকালেন।
— অয়ন মারা গিয়েছিল পাঁচ বছর বয়সে। এই বাড়ির পুকুরে পড়ে। তোর মা নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারেনি। সেদিন অয়নকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করেছিল।
— তারপর?
— তারপর তোর জন্ম। তোর মধ্যে সে অয়নকে খুঁজতে শুরু করেছিল। তোকে একই জামা পরাত, একই গল্প শোনাত, একই নামে ডাকত। একদিন তোকে অয়ন বলে ডাকতে গিয়ে তুই ভয় পেয়ে কেঁদে উঠেছিলি। সেই থেকে আমি এই ঘর বন্ধ করে দিই।
অর্কর চোখে জল এসে গেল।
— মা কি এখনো অয়নকে খোঁজে?
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
— তোর মা মারা যাওয়ার আগে শেষবার এই ঘরেই এসেছিল। সেদিন রাত থেকে আর কখনো এই ঘরের আয়নাটা পরিষ্কার করিনি।
— কেন?
বাবা এবার অর্কর দিকে তাকালেন।
— কারণ, তোর মা মারা যাওয়ার পরদিন সকালে আয়নায় ওর প্রতিবিম্ব দেখা গিয়েছিল।
অর্কর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— তাহলে মা…
বাবা তার কথা শেষ করতে দিলেন না।
— তোর মা নেই, অর্ক। কিন্তু এই বাড়িতে যে আছে, সে তোর মায়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। সে তোর মা নয়।
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে থেকে মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
— অর্ক!
দুজনেই চমকে উঠল।
— বাবা, তুই আমার ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?
বাবা অর্কর হাত শক্ত করে ধরলেন।
— পিছনে তাকাবি না। চল।
কিন্তু অর্কর পা নড়ল না।
দরজার সামনে সাদা শাড়ি পরা একজন নারী দাঁড়িয়ে।
মায়ের মুখ।
সেই চেনা চোখ। সেই স্নেহমাখা হাসি।
— অর্ক, বাবা! এতদিন পর এলি। একবার মায়ের কাছে আয়।
অর্কর চোখ ভিজে উঠল।
— মা…
বাবা চিৎকার করে উঠলেন,
— না! ওর কাছে যাস না!
নারীটি এবার বাবার দিকে তাকালেন।
— তুমি এখনো ওকে সত্যিটা বলোনি?
বাবা স্তব্ধ।
— কোন সত্যি?
নারীটি অর্কর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোর বাবা তোকে অয়নের মৃত্যুর কথা বলেছে। কিন্তু তোকে বলেনি, সেদিন পুকুরের ধারে অয়নের সঙ্গে আর একজনও ছিল।
অর্কর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
— কে?
মা ধীরে বললেন,
— তুই।
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তে জমে গেল।
অর্ক পিছিয়ে এল।
— না! আমি তো তখন জন্মাইনি!
নারীটি মৃদু হাসলেন।
— তোর জন্ম হয়েছিল, বাবা। কিন্তু তুই তো পাঁচ বছর বয়সে অয়নের সঙ্গে পুকুরে গিয়েছিলি।
অর্ক বাবার দিকে তাকাল।
বাবার চোখে জল।
— বাবা, এ কী বলছে?
বাবা এবার মাথা নিচু করলেন।
— সেদিন তোরা দুজনেই পুকুরে পড়ে গিয়েছিলি। আমি অয়নকে বাঁচাতে পারিনি। তোকে বাঁচিয়েছিলাম। কিন্তু তোর মাথায় আঘাত লেগেছিল। অনেক দিন স্মৃতি ছিল না। পরে তোর মা তোকে নিয়ে শহরে চলে যায়। আমরা ঠিক করেছিলাম, তোকে আর কোনো দিন ওই দিনের কথা মনে করাব না।
অর্কর মনে হতে লাগল, তার চারপাশের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
শৈশবের কিছু অস্পষ্ট ছবি ফিরে আসছে।
বৃষ্টিভেজা উঠোন।
একটি শিশুর হাত ধরে দৌড়ানো।
পুকুরের জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব।
আর একটি কণ্ঠ—
‘ভাই, হাতটা ছাড়িস না!’
হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকাল।
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা সাদা আলোয় ভরে গেল।
আবার অন্ধকার।
আলো ফিরতেই অর্ক দেখল, ঘরে কেউ নেই।
না বাবা, না মা।
শুধু আয়নার সামনে একটা ছোট্ট লাল জামা পড়ে আছে।
আর তার ওপর রাখা একটি পুরোনো চাবি।
অর্ক চাবিটা হাতে নিল।
দরজার বাইরে বেরিয়ে আসতেই দূর থেকে হরিপদর গলা শোনা গেল।
— অর্কবাবু! আপনি আছেন?
হরিপদ ঘরে ঢুকে অর্ককে দেখে থমকে দাঁড়ালেন।
— আপনি এত রাতে এখানে কী করছেন?
অর্ক বলল,
— বাবার সঙ্গে দেখা হলো। মা-ও এসেছিলেন।
বৃদ্ধের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— কী বলছেন! আপনার বাবা তো পনেরো বছর আগে মারা গেছেন। আর আপনার মা…
অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল,
— জানি। দুজনেই মারা গেছেন। কিন্তু একটু আগেই তো দেখলাম।
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— অর্কবাবু, একটা কথা বলব? আপনার বাবা মারা যাওয়ার পর এই বাড়িতে কেউ আর থাকেনি। আপনার মা মারা যাওয়ার আগের দিন আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আপনি কোনো দিন ফিরে এলে যেন সেটা আপনাকে দিই।
বৃদ্ধ পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন।
অর্ক কাগজটা খুলল।
মায়ের হাতের লেখা।
‘অর্ক,
তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো আমি থাকব না।
তোর দাদাকে আমরা হারিয়েছি। তোকে হারানোর ভয় নিয়ে আমি বাকি জীবন কাটিয়েছি। তোর বাবা চায় না, তুই অতীত মনে করিস। কিন্তু আমার বিশ্বাস, একদিন তোর সব মনে পড়বে।
তুই শুধু একটা কথা মনে রাখিস। অয়ন তোকে খুব ভালোবাসত। সেদিনও তোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল।
ওকে ভুলে যাস না।
— মা’
অর্ক কাগজটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
পরদিন সকালে অর্ক বাড়ি ছেড়ে শহরে ফিরে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগে দক্ষিণের ঘরের আয়নাটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল।
বহু বছর পর শঙ্খনীড়ের দরজায় তালা পড়ল।
সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল।
অন্তত অর্ক তাই ভেবেছিল।
সাত দিন পর রাতে নিজের ফ্ল্যাটে বসে সে মায়ের চিঠিটা আবার পড়ছিল। হঠাৎ ড্রয়িংরুমের পুরোনো টেলিফোনটা বেজে উঠল।
টেলিফোনটা সে বহু বছর আগে গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল।
অর্ক রিসিভার তুলল।
ওপাশ থেকে শিশুর কণ্ঠ।
— ভাই, তুই বাড়ি চলে গেলি?
অর্কর বুক কেঁপে উঠল।
— অয়ন?
— হ্যাঁ। মা তোকে খুঁজছে।
— মা কোথায়?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর শিশুটি বলল,
— মা তো আমার কাছেই আছে। কিন্তু বাবা বলেছে, এবার থেকে তুই একাই থাকবি।
অর্কর গলা শুকিয়ে এল।
— বাবা কোথায়?
ওপাশে শিশুটি হেসে উঠল।
— তুই কি জানিস না? বাবা তো সেদিনই তোর সঙ্গে শহরে চলে এসেছিল!
অর্ক ধীরে ধীরে রিসিভার নামিয়ে রাখল।
তারপর ঘরের দিকে তাকাল।
বেডরুমের দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে কেউ একজন বসে আছেন।
সাদা পাঞ্জাবি। ধুতি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
বাবা।
কিন্তু এবার অর্কর চোখ আটকে গেল ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটায়।
আয়নায় সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে।
বাবাকে দেখতে পাচ্ছে।
আর বাবার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট অয়ন।
শিশুটি এবার আর হাসছে না।
সে কাঁদছে।
তার ঠোঁট নড়ছে।
অর্ক খুব মন দিয়ে তাকাল।
শিশুটি বলছে,
‘ভাই, ওরা কেউ তোকে নিতে আসেনি। তুই এখনো পুকুরের জলের নিচে আছিস।’
সেই মুহূর্তে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
আর বহু দূরে, পনেরো বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা শঙ্খনীড়ের দক্ষিণের ঘরে, একটা টেলিফোন বেজে উঠল।
ক্রিং…
ক্রিং…
ক্রিং…
কেউ রিসিভার তুলল না।
শুধু আয়নার ওপাশ থেকে একটি শিশুর গলা ভেসে এল—
‘মা, এবার কি ভাইকে বাড়ি নিয়ে যাব?’

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা