শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬

আমাদের লোকসংস্কৃতি

১
বাংলায় রয়েছে হাজার বছরের লোকঐতিহ্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। গ্রামীণ মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে এ সংস্কৃতি আবহমানকাল ধরে পরম্পরাগতভাবে যুক্ত। যদিও বিশ্বায়নের বদৌলতে ক্রমাগত এখন বদলাচ্ছে সমাজ ও সভ্যতা। সেই বদলে যাওয়ার ছোঁয়া লেগেছে গ্রামীণ পরিমণ্ডলেও। ফলে গ্রামীণ অনেক সংস্কৃতি শহুরে নব্য-সংস্কৃতির ঠেলায় এখন অনেকটাই উবে যেতে বসেছে। আধুনিক সভ্যতা ও তথ্যপ্রযুক্তির চাপে ক্রমশ পিষ্ট হতে চলেছে গ্রামজীবনের নিজস্ব লোকায়ত সংস্কৃতি। তবে একেবারেই যে সবকিছু বদলে যাচ্ছে, তাও কিন্তু নয়। আশার কথা হচ্ছে, এখনও পরম মমতায় গ্রামীণ মানুষ তাঁর নিজস্ব আচার-সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ফলে জনসংস্কৃতির নানা ধারা-উপধারা এখনও গ্রামীণ সমাজজীবনে সজীব ও প্রাণবান।
গ্রামীণ বাংলার খাওয়াদাওয়া, স্থাপত্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, পুরাকীর্তি, লোকধর্ম, দর্শন, বাদ্যযন্ত্র, ভেষজ, জাদুচর্চা, লোকনৃত্য, লোকসংগীত, কাঠের ভাস্কর্য, লোকক্রীড়া, লোকনাট্য–সবকিছুই যুগের পর যুগ ধরে গৌরবান্বিত ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এটা ঠিক যে, তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের শিখরে এসে গ্রাম আর শহরের পার্থক্য অনেকটাই ঘুচে গেছে। ফলে নিত্যনতুন বিদেশি সংস্কৃতি গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় ঢুকে লোকঐতিহ্যে বার বার আঘাত হানছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্র লোকগান, লোকনাট্য, মেলা, উৎসব এবং পার্বণাদিও বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে। সে-সঙ্গে লুপ্ত হতে চলেছে অসংখ্য লোকাচার। অথচ আড়াই দশক আগেও বাংলার শত-সহস্র ভাবুক-দার্শনিক-শিল্পী নানা ধারার গান, নাট্য, আচার, সাহিত্যকে জিইয়ে রেখেছিলেন।
একটা সময়ে গ্রামে গ্রামে নানা ‘রঙ্গে-ঢঙ্গে’ লোকাচার-সংস্কৃতি উদযাপন হতো, ঔৎসুক ভাবপ্রবর শ্রোতামণ্ডলীও ছিল। সে পরিবেশ ও পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। লোকসংস্কৃতির নানান ধারা আগের চেয়ে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এলেও ধর্মের প্রথাগত গণ্ডি ছাপিয়ে গ্রামীণ বাংলার চিরায়ত সমন্বয়বাদী ঐতিহ্য বিকাশের ধারা ঠিকই অব্যাহত আছে। আসলে গ্রামের সংস্কৃতিটাই ভিন্ন। এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত লেখক যেমন রচনা করছেন নবীর জীবনকাহিনি নিয়ে পুঁথি, তেমনই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত লেখক রচনা করছেন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলাকাব্য। এই সমন্বয়বাদী ঐতিহ্যই গ্রামীণ বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির মূল দর্শন, মূল চেতনা।

২
গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপন, পেশা, আচার-বিশ্বাস, খাবারদাবার, মনন-রুচি থেকে শুরু করে লোকক্রীড়া, লোকধর্ম, লোকশিল্প, লোকায়ত সাহিত্যের সবকিছুই বৃহৎ অর্থে লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। এই লোকায়ত সংস্কৃতিই হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির মূল উৎস। বাংলার কৃষক-জেলে, বাংলার কামার-কুমার-তাঁতি-ধোপাসহ নানা পেশার মানুষই এ সংস্কৃতি নির্মাণ করেছেন, ঘটিয়েছেন বিস্তার। জাত, ধর্ম, গোত্র, বর্ণের প্রাবল্য থাকলেও তাঁরাই মূলত একই লোকায়ত সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিলেন। তাঁদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সমন্বয়বাদী চেতনা; যার মর্মমূলে রয়েছে অসাম্প্রদায়িতকতা, সহাবস্থান, মানবিকতা আর সৌহার্দ্য।
অজস্র শিল্পী, সাধক, কীর্তনিয়া, বাউল, ফকির ও সাধুসন্তদের বিচরণক্ষেত্র ছিল এই বদ্বীপ। গ্রামীণ জনপদ মাতানো বহুবর্ণিল সেই সুর আর গান আপন চেহারা হারিয়ে পাংশুটে ও বিবর্ণ হয়ে পড়লেও এ শ্রেণিভুক্ত সাধকেরা এখনও সমন্বয়বাদের সুর ছড়িয়ে দিচ্ছেন। লৌকিক সমাজের মানুষ এসব সমন্বয়ের বার্তা মন থেকেই মানতেন এবং চর্চা করতেন।
লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাসকেও গ্রামের মানুষেরা নিজেদের সংস্কৃতিতে ঠাঁই দিয়েছেন। ফলে দুর্যোগ-দুর্বিপাকে, অমঙ্গল দূরীকরণে মানুষজন পির-ফকির-সাধু-সন্তের দ্বারস্থ যেমন হতেন, তেমনই পির-দরবেশ কিংবা দেবদেবীর কাছে মানত করে সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে মানসিক শান্তিও পেতেন। বন্যা, খরা কিংবা শিলাবৃষ্টি থেকে ফসল রক্ষা, বন্ধ্যা নারীর সন্তান কামনা, স্বামীকে বশে আনা থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক চলাফেরায় নানা সমস্যার সমাধান লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ীই গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় মানুষজন করতেন। গ্রামীণ সমাজে ওঝা, কবিরাজ, তান্ত্রিক, মাওলানারাই বৈদ্যের ভূমিকা পালন করতেন। ঝাড়-ফুঁক, মন্ত্র, দোয়া, তাবিজ ইত্যাদির সাহায্যেই নতুন-পুরাতন রোগ সারানোর কাজ সারতেন বৈদ্যরা! তবে অবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় সংগত কারণেই কবিরাজ, তান্ত্রিকদের পেশা ক্রমশ বদলাচ্ছে। সেই পেশা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ওইসব কবিরাজ, ওঝা, তান্ত্রিক, মাওলানার লোকচিকিৎসা পদ্ধতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে পড়ছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে কৃষি উৎপাদনের সময় নানামুখী লোকাচারেও গানের ব্যবহার রয়েছে। হালচাষ, বীজ রোপণ, ফসল কাটা থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত নানা রকম উৎসবের আয়োজন করা হয়, এতে আনুষঙ্গিক লোকাচার হিসেবে গান ও মন্ত্র পরিবেশিত হয়। গ্রামীণ লোকাচারের এ ধারাগুলো নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ মেনে কৃষকেরা পালন করে থাকেন। একইভাবে জেলে, কুমার, কামারসহ নানা লোকায়ত পেশার মানুষের মধ্যেও নানা লোকাচারের প্রচলন আছে।
মানুষের জন্ম, বিয়ে, মৃত্যু–সবখানেই নানা ধরনের আচার লোকসমাজে প্রচলিত আছে। যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় গ্রামের মানুষেরা সে ধারা বহমান রেখেছেন। সংস্কৃতি এখানে আপন গতিতে ধাবমান। এখানে বিচিত্র সব গানের ধারার পাশাপাশি গ্রামীণ চিরায়ত সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ, কুস্তি-খেইড়, লাঠিখেলা, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধাসহ নানা লৌকিক ক্রীড়ারও ব্যাপক প্রচলন আছে। মহররম উৎসব, দোলউৎসবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনেও শেষ পর্যন্ত গানই প্রধান হয়ে ওঠে। জাতপাত, বৈষম্য আর ভেদাভেদ ভুলে সেই আনন্দযজ্ঞে গান ভাসান গ্রামীণ মানুষ।
আমাদের গ্রামীণ বাংলার যে উঠোন, সেখানে লোকসংস্কৃতির অসংখ্য পরিবেশনায় মুখর থাকে বারো মাস। অবসর পেলেই গ্রামের মানুষ বসান গান, লোকনৃত্য কিংবা লোকনাট্যের আসর। যাত্রাগান, পালাগান, বাউলগান, কীর্তন, গাজীর গান, কিচ্ছাপাঠের আসর, ভাটিয়ালি, ধামাইলগান, মালসিগান, বারোমাসি, সূর্যব্রতের গানসহ নানা পরিবেশনা এখানে হয়। এক গ্রামের যশস্বি শিল্পীর ডাক পড়ে আরেক গ্রামে। গানের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার এ বড় অদ্ভুত সম্মিলন। তাঁদের শিল্পীসত্তাও প্রকৃতিপ্রদত্ত। যুগ যুগ ধরে তাঁরা বংশপরম্পরায় সংস্কৃতির এ ধারা বহমান রেখেছেন। দিনে যে মাঝি খেয়া নৌকা চালায়, যে জেলে মাছ ধরে কিংবা যে কৃষক মাঠে ফসল ফলায়–রাতে তাঁরাই মশহুর কীর্তনিয়া, যাত্রাভিনয়শিল্পী অথবা দক্ষ পালাকার। এঁদের কারও কারও একতারা, দোতরা, ডপ্কি, ঢোল, মন্দিরা, করতাল, বাঁশিসহ লোকবাদ্যের লহরিতে মুখরিত হয় গ্রামের পরিপার্শ্ব, বিমুগ্ধ হয় মানুষ।
লোকগান ছাড়াও লোকসাহিত্যের নানা ধারা গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত আছে। এর মধ্যে লোককাহিনি, লোকছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ, মন্ত্র, লোককথা, লোকগীতিকা উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গক্রমে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় থাকা লোকস্থাপত্য কিংবা লোকশিল্পকলা নিয়েও কিছু বলা যেতে পারে। লোকস্থাপত্যের এক সময়ে সুপরিচিত খড় বা শণের ঘর, মাটির ঘর, পাটকাঠি বা শণের বেড়া জাতীয় স্থাপত্যের দেখা এখন কমই মেলে। মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সানকির ব্যবহারও এখন অল্পই বলা চলে। মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে ক্রমশ নির্বাসিত হচ্ছে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, মৃৎশিল্প, লৌহ ও কাঁসাশিল্প। তবে উৎসব উপলক্ষে ঘরে-বাইরে বৃহৎ পরিসরে আলপনা কিংবা লোকচিত্র আঁকার বিষয়টি এখনও সমভাবে রয়েছে।

৩
গ্রামীণ মানুষ ঐতিহ্য-পরম্পরায় চিরকালই বিনোদনপ্রিয়। তাই উপলক্ষ যাই হোক, সেখানে অনায়াসেই ঢুকে পড়ে আরও নানা কৃষ্টি-আচার-সংস্কৃতি। যেমন, গ্রামীণ মেলার কথাই যদি ধরি, তাহলে দেখা যায়–সাধারণত যেকোনো লৌকিক দেবদেবী বা পিরের আবির্ভাব কিংবা তিরোধান তিথি অথবা চৈত্র-সংক্রান্তি কিংবা বাংলা নববর্ষ, এসব উপলক্ষেই মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। কিন্তু শেষতক সেটি আর বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে না, হয়ে পড়ে হিন্দু-মুসলিম সব মানুষের মিলনমেলা। ধর্মীয় আচার/রীতিনীতির অংশটুকু ছাড়া সবখানেই সব ধর্মের মানুষের থাকে সমান উপস্থিতি। তাই তো যে উপলক্ষেই মেলার আয়োজন হোক, সেখানে সংগত কারণেই কিছু পৃথক উৎসব/আয়োজন ঘনিষ্ঠমাত্রায় সংযুক্ত হয়ে পড়ে। মেলা উপলক্ষে আয়োজিত ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, পুঁথিপাঠ, কবির লড়াই, পুতুলনাচ, সার্কাস, নাগরদোলা, বাউলগানের আসর–এ সংযুক্তিরই একটা অংশ।
বছরজুড়েই গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় নানা ধরনের লোকমেলার চল রয়েছে। তবে চৈত্র-বৈশাখ মাসের মেলা অন্যসব আয়োজন থেকে একটু পৃথক। এ সময়ের মেলাগুলোর বর্ণিল রূপ ও ঐতিহ্য ইতোমধ্যেই আলাদা সত্তা ও অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এসব মেলার অধিকাংশই কয়েকশ বছরের প্রাচীন। ভাটি অঞ্চলের প্রাচীন মেলাগুলো সচরাচর নদীর পাড় ও বটগাছের নিচে হয়ে আসছে। এর বাইরে বিস্তীর্ণ মাঠ ও খোলা প্রান্তরে মেলা আয়োজনের রেওয়াজও প্রচলিত রয়েছে। পুরুষেরা মেলা থেকে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের জন্য ভালো কিছু সওদা করে আনেন আর নারীরা বাড়িতে বসে মুখরোচক ও মজাদার খাবারের আয়োজন করেন। ‘শালি ধানের চিড়ে, বিন্নে ধানের খই, নতুন চালের পিঠাপায়েস, গামছা বাঁধা দই’–সত্যিকার অর্থেই গ্রামের খাবারদাবার সম্পর্কে প্রচলিত এ প্রবচনের উপস্থিতি গ্রামীণ জনসংস্কৃতিতে ব্যাপকমাত্রায় লক্ষ করা যায়।
মেলার সময়টাতে অর্থাৎ, চৈত্র-বৈশাখ মাস এলেই গ্রামের নারীরা উদগ্রীব হয়ে থাকেন–কখন বাপের বাড়ি থেকে ভাই কিংবা স্বজন আসবেন, আর তিনি নাইওর যাবেন। যাঁরা নাইওর যেতে পারেন না কিংবা কোনো কারণে যাওয়া হয় না, তাঁদের জন্য মেলা থেকে কেনা সাবান, স্নো-পাউডার কিংবা অন্য কোনো সামগ্রী নিয়ে পরদিনই স্বজনেরা হাজির হন। তবে এ আচার-সংস্কৃতিতে এখন চির ধরেছে, অনেকটাই লোপ পেতে চলেছে। পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে মেলার পরিসর। এরপরও বাংলার জনপদে তারিখ-তিথি মেনে ঐতিহ্য-পরম্পরায় মেলা আসে। আর বাঙালির লোকায়ত জীবনে মেলা মানেই উৎসব ও নানা আচার-বিশ্বাস-সংস্কার।

৪
নকশিকাঁথা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির আরেক ঐতিহ্য। চলমান সংস্কৃতিতে এখনও এর বিন্দুমাত্র চির ধরেনি। গ্রামীণ নারীরা ভেতরে পুরোনো-ছেঁড়া আর ওপরে শক্ত-ভালোগোছের কাপড়ের কয়েক ফেরতা দিয়ে স্তর সাজিয়ে সেলাই করে কাঁথা তৈরি করেন। সুচের অসামান্য শিল্পশৈলীতে কাঁথা হয়ে ওঠে সৌন্দর্যের প্রতীক। এখনও অক্ষর-জ্ঞানহীন স্বশিক্ষিত গ্রামীণ নারীরা পরম মমতায় ঐতিহ্য-পরম্পরাকে আগলে ধরে নকশিকাঁথা তৈরি করছেন। তাঁরা কেবল চোখের ঠাহরে এবড়ো-খেবড়ো অক্ষরে ভুল বানানে কাঁথায় লিখে ফেলছেন মনের সব অব্যক্ত কথা। লোকশিল্পের এ বড় অদ্ভুত বিকাশ!
গ্রামীণ নারীদের সুঁই-সুতার সমন্বয়ে মোহনীয় কারুকাজের নকশিকাঁথা লোকজ-শিল্প হিসেবে সুপরিচিত। আমাদের বৈচিত্র্যময় আচারগত সংস্কৃতিতে এই শিল্পের মূল্যবান ঐতিহ্য ও প্রাণবন্ত বিকাশ অনন্য মাত্রায় উদ্ভাসিত। নকশিকাঁথায় সুচের ফোঁড়ে নারীরা নকশিকাঁথায় সচরাচর গাছপালা, জীবজন্তু ও প্রবাদ-প্রবচনসহ রাধা-কৃষ্ণ, লাঙল-জোয়াল কাঁধে কৃষক, নৃত্যরত রমণী ও প্রেমরত নারী-পুরুষের নকশা করে থাকেন। এর বাইরে বাঘ, সিংহ, হরিণ, হাতি, মাছ, হাঁস, ময়ূরসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি নানা রঙের সুতায় নিপুণ দক্ষতায় নকশার বাহারি উপস্থাপনা দেখা যায়।
নকশিকাঁথায় জীবজন্তু ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির পাশাপাশি রাজপরিবার ও দরবারের চিত্র স্থান পায়। ধর্মীয় কাহিনির মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের কারবালার বিষাদঘন প্রান্তর আর হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবদেবীর চিত্র সুচের ফোঁড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। গ্রামীণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার একটা পরিচয়ও নকশিকাঁথায় পাওয়া যায়। নকশিকাঁথা ছাড়াও লোকশিল্পীরা মাটি, বাঁশ, বেত, কাঠ, বয়নসহ নানা ধরনের উপকরণ তৈরিতে নৈপুণ্যের পরিচয় রাখছেন।

৫
বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রকাশভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্য এতই আকর্ষণীয় যে, তা নিতান্তই বাঙালির নিজস্ব সম্পদ। গ্রামীণ মানুষের জীবনাচরণ ও সংস্কৃতি অত্যন্ত বিচিত্র, বর্ণিল, সমৃদ্ধ ও প্রাণবান। তবে দ্রুত সময় বদলাচ্ছে। নানা গতিপ্রকৃতি পাচ্ছে লোকসংস্কৃতি। আধুনিক সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনেককিছুই লুপ্ত হচ্ছে, বিলীন হচ্ছে পরিচিত লোকায়ত সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারা-উপধারাগুলো। তা সত্ত্বেও লোকসংস্কৃতির সতেজ ধারাগুলো এখনও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রাণশক্তি হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে হিল্লোল তোলে।
গ্রামীণ জীবনে লোকায়ত জীবনাচরণ ও তার অন্তর্গত সংস্কৃতি জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠার এক মহিমান্বিত মিলনসূত্রস্বরূপ। শত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা বাংলার এই নিজস্ব সাংস্কৃতিক রূপটির চেতনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বৃহত্তর সমাজব্যবস্থায় ছড়িয়ে দিতে পারলেই কেবল সকল গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে অতি সহজেই মোকাবিলা করা যাবে।(সংগৃহিত)


লেখক : ফোকলোর-গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা